মোঃ শরীফুল ইসলামঃ
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উদীয়মান অর্থনীতিতে চীনের অংশগ্রহণ এখন একটি নতুন রূপ নিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত চীনে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের চেয়ে একক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (EPC contractors) হিসেবে মেগা প্রকল্প নির্মাণের প্রধান ঝোঁক থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোর মাধ্যমে বেইজিং তাদের কৌশল পরিবর্তন করে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) এবং টেকসই শিল্পায়নের দিকে জোর দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে তৈরি হতে যাওয়া ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ এবং মোংলা পোর্টে পরিকল্পিত নতুন লজিস্টিকস হাব বাস্তবায়নে গৃহীত পদক্ষেপ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় রকমের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলায় নির্মিত এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে সরকারি পূর্বাভাসে জানা গেছে।
অবকাঠামো থেকে উৎপাদন খাতে রূপান্তরপদ্মা সেতুর মূল কাঠামো, কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা রেল সংযোগের মতো মেগা প্রকল্প নির্মাণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চীন এখন বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে গতিশীলতা: চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে ওষুধ, তৈরি পোশাক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও হাই-টেক পণ্যের কলকারখানা গড়ে তোলার বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো: মহেশখালীতে ৩য় ফ্লোটিং স্টোরেজ ও রিগ্যাসফিকেশন ইউনিট (FSRU) এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন শক্তিশালী করতে চীন তাদের আর্থিক ও কারিগরি অংশীদারিত্ব বজায় রাখছে।
লজিস্টিকস ও পরিবহন: চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সংস্কারেও চীন ব্যাপক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগের এই নতুন ধারায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন:
১. অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান (সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ – সিপিডি) বলেন, “চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং উচ্চ শ্রমব্যয়ের কারণে চীন এখন তুলনামূলক শ্রম-সাশ্রয়ী দেশে তাদের উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরিত করতে চাইছে।
বাংলাদেশে চীনা শিল্পাঞ্চল ও সরাসরি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া মূলত আন্তর্জাতিক ‘China-plus-one’ কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে করে বাংলাদেশের রপ্তানি বাস্কেট আরও বহুমুখী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
২. এম হুমায়ুন কবির (সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক) বলেন, “অবকাঠামো ও কৌশলগত খাতে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের অর্থায়ন নিশ্চিত করে। তবে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
ঋণ গ্রহণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা তৈরি করছে কি না—সে বিষয়ে নীতিপ্রণেতাদের সার্বক্ষণিক ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment) জরুরি।
“৩. বাণিজ্যিক ও নীতি বিশ্লেষকদের একাংশ বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, এককভাবে ঠিকাদারি নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থান তৈরি করা চীনের এই নীতি পরিবর্তন ইতিবাচক।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে নীতিগত ধীরগতি দূর করে বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রশাসনিক জটিলতা ও নকশা সংক্রান্ত সময়ক্ষেপণ কাটিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দেশীয় কর্মীদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে (Technology Transfer) চুক্তি ত্বরান্বিত করতে হবে।
টেকসই প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাবিদ্যুৎ, টেক্সটাইল, তথ্যপ্রযুক্তি ও লজিস্টিকস খাতের সমন্বয়ে চীনে বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের (FDI) অন্যতম শীর্ষ উৎসে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, অবকাঠামোগত ঋণের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে আঞ্চলিক করিডোর ও রফতানিমুখী উৎপাদন খাতে এই অংশীদারিত্বকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এক নতুন প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে।
































