| |
  • প্রচ্ছদ
  • লীড-২
  • কুমিল্লার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  • কুমিল্লার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্য

    Icon
    মো: শরীফুল ইসলাম
    প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

    ​বাংলাদেশর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা কুমিল্লা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাস্কর্য, রাজনীতি আর সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা এই অঞ্চলটি। প্রাচীনকাল থেকেই এই জনপদটি তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যের কারণে উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।

    ​১. কুমিল্লার নামকরণ ও প্রাচীন ইতিহাস
    ​কুমিল্লা অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল ‘ত্রিপুরা’। ১৭৯০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ত্রিপুরা জেলা গঠিত হলেও ১৯৬০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘কুমিল্লা’ রাখা হয়।

    এর নামকরণ নিয়ে বেশ কয়েকটি লোককথা প্রচলিত আছে:
    ​অনেকের মতে, প্রাচীন ‘কমলাঙ্ক’ বা ‘কর্মান্ত’ (যা ছিল খড়গ রাজবংশের রাজধানী) শব্দ থেকে ‘কুমিল্লা’ নামের উৎপত্তি। ​আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই অঞ্চলে একসময় প্রচুর কমলার চাষ হতো, যা থেকে ‘কমলাঙ্গ’ এবং পরবর্তীতে ‘কুমিল্লা’ শব্দের সৃষ্টি।

    ​প্রাচীনকালে কুমিল্লা ছিল বিখ্যাত সমতট রাজ্যের অংশ। পরবর্তীতে এটি দেব রাজবংশ, খড়গ রাজবংশ এবং চন্দ্র রাজবংশের শাসনে আসে। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলটি বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল।

    ​২. প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য: ময়নামতি ও লালমাই
    ​কুমিল্লার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় জড়িয়ে আছে এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সাথে। লালমাই-ময়নামতি পাহাড়িয়া অঞ্চলে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

    ​শালবন বিহার: অষ্টম শতকে দেব বংশের চতুর্থ রাজা শ্রী ভবদেব এটি নির্মাণ করেন। এটি ছিল তৎকালীন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করতে আসত।

    ​কোটিলা মুড়া ও আনন্দ বিহার: এগুলো প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন।

    ​ময়নামতি জাদুঘর: খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা), ব্রোঞ্জের মূর্তি ও গহনা এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে, যা প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সাক্ষ্য দেয়।

    ​৩. ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপত্য
    ​শুধু প্রাচীন যুগই নয়, মধ্যযুগ ও ব্রিটিশ আমলেরও বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই কুমিল্লা।

    ​ত্রিপুরা মহারাজার প্রাসাদ: কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ধর্মসাগর দিঘিটি ১৭৫৮ সালে ত্রিপুরার মহারাজ ধর্মমাণিক্য খনন করান, যা আজ শহরের অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্র।

    ​শাহ সুজা মসজিদ: মোগল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা এই ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করেন।

    ​ওয়ার সেমেট্রি (যুদ্ধ সমাধি): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত কমনওয়েলথ দেশের ৭৩৭ জন সৈনিকের সমাধি রয়েছে এখানে, যা প্রতিবছর দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

    ​৪. শিক্ষা ও সংস্কৃতির রাজধানী
    ​কুমিল্লাকে বলা হয় ‘শিক্ষার শহর’। দেশের শিক্ষা বিস্তারে এই জেলার অবদান অপরিসীম।

    ​শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ এবং পরবর্তীতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, এবং দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবোর্ড ‘কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড’ এই অঞ্চলের শিক্ষার মেরুদণ্ড।

    ​বার্ড (BARD): ড. আখতার হামিদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি’ (বার্ড) কুমিল্লাতেই অবস্থিত, যার ‘কুমিল্লা মডেল’ বিশ্বজুড়ে গ্রামীণ উন্নয়নের একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত।

    ​সঙ্গীত ও সাহিত্য: সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শচীন দেববর্মণের মতো কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞদের স্মৃতিবিজড়িত এই ভূমি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাঁর জীবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় কুমিল্লায় অতিবাহিত করেছিলেন এবং এখানেই তাঁর বহু বিখ্যাত কবিতা ও গান রচিত হয়।

    ​৫. রসনা বিলাস: খাদি ও রসমালাই
    ​কুমিল্লার নাম নিলেই যে দুটি জিনিস চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হলো—খাদি কাপড় এবং রসমালাই।

    ঐতিহ্যবৈশিষ্ট্য
    কুমিল্লার রসমালাই‘মাতৃভাণ্ডার’ এর রসমালাই খাঁটি ছানা ও ক্ষীরের এক অপূর্ব সৃষ্টি, যার স্বাদ অতুলনীয় এবং দেশ-বিদেশে সমাদৃত।
    খাদি ও তাঁত শিল্পমহাত্মা গান্ধীর স্বদেশী আন্দোলনের সময় থেকে কুমিল্লার খাদি কাপড়ের জনপ্রিয়তা শুরু। এই হাতে বোনা টেকসই কাপড় কুমিল্লার অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য।

    ​কুমিল্লার ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়, বরং এটি আমাদের বর্তমান সংস্কৃতির এক বিশাল ভিত্তি। প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের গৌরব থেকে শুরু করে খাদি কাপড়ের সুতো আর রসমালাইয়ের মিষ্টি স্বাদ—সব মিলিয়ে কুমিল্লা বাংলাদেশের মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

    লেখকঃ মোঃ শরীফুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক, এশিয়ান দর্পণ। 

    আরও পড়ুন