শরীফ ওসমান হাদির ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীর উদ্বেগ, শঙ্কা এবং বহুমাত্রিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি একজন সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠক এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতিতে ছিলেন। তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও উচ্চকণ্ঠ—বিশেষ করে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি আপসহীন ছিলেন। এমন একজন রাজনৈতিক কর্মীর ওপর প্রকাশ্য গুলিবর্ষণ কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন বা হালকা কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির গভীর সংকেত বহন করে।
হাদির ওপর হামলার পর থেকেই এর কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন সব জায়গাতেই চলছে অনুমান, অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ। একপক্ষ দাবি করছে, ওই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মির্জা আব্বাসের অনুসারীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত। তবে এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষকই সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। আবার ভিন্ন আরেকটি আলোচনায় উঠে এসেছে, এই ঘটনার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে এবং তারা হাদিকে সরিয়ে দিয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমকে ওই আসনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
এই সব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য সামনে আসেনি, যা নিশ্চিতভাবে কাউকে দায়ী করে। প্রকৃত সত্য উদঘাটনের একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত। তদন্ত ছাড়া কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন বিপজ্জনক, তেমনি এটি মূল ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ারও একটি কৌশল হতে পারে।
তবে অভিযোগ যেদিক থেকেই আসুক, ঘটনাটির রাজনৈতিক মাত্রা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এই হামলার পেছনে মূলত দুটি বড় উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে। প্রথমত, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রকমের নাজুক- এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, সেই নাজুক পরিস্থিতিকে সামনে এনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানই যেন সম্ভব না হয়-সে ধরনের একটি পরিবেশ তৈরি করা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নতুন কোনো কৌশল নয়। যখনই নির্বাচন ঘনিয়ে আসে এবং জনগণের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বাড়ে, তখনই সহিংসতা, হামলা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রবণতা দেখা যায়। এর লক্ষ্য একটাই- নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করা এবং পরে দাবি তোলা যে, দেশে নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি নেই। শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাকে এই প্রেক্ষাপটের বাইরে রেখে দেখার সুযোগ নেই।
এই মুহূর্তে দেশের একটি বড় বাস্তবতা হলো— দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত অংশগ্রহণ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি, অনেকে আগেই নিরুৎসাহিত হয়েছেন। ফলে ভোটের অধিকার আজ মানুষের কাছে কেবল একটি সাংবিধানিক বিষয় নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। সারা দেশে ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী আগ্রহ বাড়ছে, মানুষ ভোট দিতে চায়। এরই মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতাই কিছু গোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পতিত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি অংশ কোনোভাবেই চাইবে না দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক— এটি অনুমান নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা। কারণ, সুষ্ঠু নির্বাচন মানেই জনগণের প্রকৃত রায়, আর সেই রায় অনেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই নির্বাচন পেছাতে বা বানচাল করতে অস্থিরতা সৃষ্টি করা তাদের জন্য একটি কার্যকর পথ হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে হাদির ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর ওপর আক্রমণ নয়; বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর একটি পরোক্ষ আঘাত। যদি এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে, প্রার্থীরা মাঠে নামতে নিরুৎসাহিত হবেন এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের ভোটাধিকার আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযত থাকতে হবে, গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনার দ্রুত, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। দোষীরা যেই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে— এটাই জনআস্থার একমাত্র পথ।
একই সঙ্গে দেশে-বিদেশে যারা উস্কানিমূলক তৎপরতায় জড়িত, যারা সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায়, তাদের এই দেশ-বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড জরুরিভিত্তিতে বন্ধ করা দরকার। নির্বাচন বানচালের যেকোনো চেষ্টা আসলে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারই শামিল।
শেষ পর্যন্ত একটি কথাই সবচেয়ে স্পষ্ট— গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সহিংসতার হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এই উপলব্ধির জায়গা থেকেই হাদির ওপর হামলার ঘটনাকে আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতা কখনো কখনো কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার কার স্বার্থে যায়, আর কার স্বার্থে যায় না— এই প্রশ্ন অতীতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বর্তমানেও তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
শরীফ ওসমান হাদির রাজনৈতিক অবস্থান জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ও স্পষ্টভাবে স্বাধীন মতাদর্শনির্ভর হওয়ায় তিনি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রবাহের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। এই ধরনের রাজনৈতিক কণ্ঠ নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় থাকলে ভোটারদের সামনে বিকল্প তৈরি হয়, ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ আসে। স্বাভাবিকভাবেই এই বাস্তবতা সবাই স্বস্তির সঙ্গে গ্রহণ করবে— এমনটি ভাবা সরলতা হবে। ফলে হাদির ওপর হামলাকে কেবল ব্যক্তি বা আসনভিত্তিক দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্কের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা জরুরি।
এখানে ভারতের প্রসঙ্গ সরাসরি না বললেও পরোক্ষভাবে ওঠে আসে। বাংলাদেশের নির্বাচন, সরকার গঠন কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন নয়। অতীতে দেখা গেছে, শক্তিশালী ও স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠা অনেক সময় আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। এই বাস্তবতায় নির্বাচন বানচালের যেকোনো অপচেষ্টা শুধু অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র নাও হতে পারে; বরং এর সঙ্গে বহুমাত্রিক স্বার্থ জড়িত থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এই কারণেই হাদির ওপর হামলার ঘটনার পর রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি যদি যথাসময়ে ও দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা না হয়, তাহলে বার্তা যাবে ভুল। সেটি হচ্ছে— সহিংসতার মাধ্যমে রাজনীতির গতিপথ বদলানো সম্ভব। আর সেটি হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হবে সাধারণ মানুষের। ভোটাররা আবারও আতঙ্কে পড়ে যাবেন, প্রার্থীরা মাঠে নামতে সাহস হারাবেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো প্রশ্নটাই ফিরে আসবে— এই দেশে আদৌ কি অবাধ নির্বাচন সম্ভব?
এখনো সময় আছে। নির্বাচন বানচালের যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং সচেতন নাগরিক সমাজের। শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে— বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো বৈধতা নেই এবং জনগণের ভোটের অধিকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের একমাত্র উৎস। অন্যথায়, এই হামলা শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর ওপর আঘাত হিসেবেই নয়, বরং গণতন্ত্রের ওপর আরেকটি কালো অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।
এই কলামের মূল বক্তব্য তাই স্পষ্ট— শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলা কোনো ব্যক্তি-রাজনীতির দ্বন্দ্ব নয়, এটি একটি সময়োপযোগী রাজনৈতিক বার্তা। সেই বার্তা হলো: নির্বাচন ঘনিয়ে এলে সহিংসতা বাড়ানো হবে, আতঙ্ক তৈরি করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণকে আবারও ভোটের অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলবে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে ভবিষ্যতে আরও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ বহু ত্যাগের বিনিময়ে ভোটাধিকার অর্জন করেছে। সেই অধিকার কেড়ে নেয়ার যেকোনো অপচেষ্টা কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে নয়, এটি রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার শামিল। তাই আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য নয়, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক ঐকমত্য— যেখানে সহিংসতার কোনো জায়গা থাকবে না, ষড়যন্ত্রের কোনো সুযোগ থাকবে না এবং জনগণের রায়ই হবে একমাত্র নির্ণায়ক।
আমরা দোয়া করব শরীফ ওসমান হাদি বেঁচে থাকুন, তিনি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন এবং এই হামলার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কারণ এই বিচার শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর ন্যায়বিচার নয়, এটি আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে এক ধরনের পরীক্ষাও বটে। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই।
সিরাজুল ইসলাম: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

































