বিশ্ব রাজনীতির আজকের বাস্তবতা এক ধরনের অদৃশ্য জাল, কোথাও আগুন লাগলে তার ধোঁয়া অন্য প্রান্তে গিয়ে চোখ জ্বালায়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা সেই বাস্তবতারই এক নির্মম উদাহরণ।
আমরা অনেক সময় ভাবি, যুদ্ধ তো অনেক দূরে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই দূরের যুদ্ধ ঢাকার বাজারে, চট্টগ্রামের বন্দরে, খুলনার কৃষকের জমিতে এসে পড়ে। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের হিসাবের অংশ।
তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির খরচ বাড়ে না, বাড়ে চালের দাম, ডালের দাম, এমনকি মানুষের স্বপ্নের দামও। কারণ অর্থনীতি কখনো আলাদা কোনো সত্তা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে এই চাপ আরও প্রকট। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, যে শিল্প চালাই, তার বড় অংশই আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা মানেই আমাদের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। সরকার ভর্তুকি দিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, কিন্তু এটি যেন ফুটো নৌকায় বালতি দিয়ে পানি ফেলার মতো, সমস্যা থেকে যায়, শুধু সময় কেনা হয়।
এই অস্থিরতা আবার একা আসে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা। ইউরোপ বা আমেরিকায় যদি ভোক্তারা ব্যয় কমায়, তাহলে প্রথম আঘাত পড়ে আমাদের তৈরি পোশাক খাতে। কারখানার মেশিন ধীরে চলে, শ্রমিকের হাতে কাজ কমে, আর পরিবারের রান্নাঘরে হিসাব আরও কষে করতে হয়। তার সঙ্গে আছে রেমিট্যান্সের অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির জীবিকা যদি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও সংকুচিত হয়। এক অর্থে দূরের যুদ্ধ আমাদের ঘরের ভাতের থালায় এসে প্রভাব ফেলে-শুধু আমরা সেটা একটু দেরিতে বুঝতে পারি।
এই জায়গায় এসে প্রশ্নটা শুধু অর্থনীতির নয়, এটি প্রস্তুতিরও প্রশ্ন। আমরা কি এখনো একক উৎসের ওপর নির্ভর করে থাকব, নাকি বিকল্প পথ খুঁজব? কারণ বিশ্ব এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ‘দূরত্ব’ আর কোনো নিরাপত্তা দেয় না-এটি শুধু একটি ভ্রম।
এই অর্থনৈতিক অস্থিরতার ভিতরেই আমরা আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি, রাজনীতিতে নারীর অবস্থান। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পরিসংখ্যান আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় বৈদেশিক মুদ্রাকরায়। নারীরা রাজনীতিতে আছেন, কিন্তু ক্ষমতায় নেই। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকট। আমরা গর্ব করি, সংসদে সংরক্ষিত আসন আছে, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রতিনিধিত্ব কি বাস্তব ক্ষমতায় রূপান্তরিত হচ্ছে? নাকি এটি একটি সুন্দরভাবে সাজানো প্রদর্শনী, যেখানে নারী দৃশ্যমান, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নেই?
এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়। নেপাল, ভারত, পাকিস্তান-সব জায়গায় একই চিত্র। কোটা আছে, আইন আছে, কিন্তু ‘জেতার মতো’ আসনগুলো এখনো পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ সুযোগ তৈরি করা হয়, কিন্তু সেই সুযোগের ভিতরে প্রবেশের দরজা অর্ধেক খোলা থাকে। এখানে একটি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ আছে, আমরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রাখতে চাই। যেন বলা হচ্ছে, ‘আপনি থাকবেন, কিন্তু সীমার মধ্যে।’
রাজনীতির এই চিত্রটি আসলে অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। যেমন অর্থনীতিতে আমরা নির্ভরশীল, তেমনি রাজনীতিতেও ক্ষমতার কাঠামো নির্ভরশীল থাকে একটি সীমিত গোষ্ঠীর ওপর। এই নির্ভরতা ভাঙতে না পারলে, কোনো ক্ষেত্রেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীদের জন্য রাজনীতি এখনো একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা-সব মিলিয়ে এটি একটি অসম প্রতিযোগিতা। ফলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, আমরা কি সত্যিই সমতা চাই, নাকি সমতার একটি প্রতীকী ছবি?
এই ক্ষমতার প্রশ্নটি আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় আমাদের পানির রাজনীতিতে, বিশেষ করে গঙ্গা চুক্তির প্রসঙ্গে। ১৯৯৬ সালের চুক্তি একসময় একটি আশার প্রতীক ছিল, কিন্তু আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, সেটি অনেকটাই সময়ের বাইরে পড়ে গেছে। নদী কখনো কাগজের নিয়ম মানে না। জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের পরিবর্তন এবং ঋতুভিত্তিক প্রবাহের বৈচিত্র্য-সবকিছু মিলিয়ে আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ নতুন। ফলে সেই পুরোনো কাঠামো দিয়ে নতুন সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, চুক্তির ভাষা এবং বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক। কাগজে পানি ভাগ হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই পানি কোথায় পৌঁছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ফারাক্কায় যে হিসাব, তা হার্ডিঞ্জ ব্রিজে এসে অনেক সময় মেলে না। এই ফাঁকটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি রাজনৈতিকও। কারণ পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি ক্ষমতারও একটি মাধ্যম। যে পানি নিয়ন্ত্রণ করে, সে একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব স্পষ্ট-লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পানীয়জলের সংকট তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।
এখানেও আমরা একই সমস্যার মুখোমুখি, নির্ভরতা। আমরা একটি চুক্তির ওপর নির্ভর করছি, যা সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ঠিক যেমন আমরা জ্বালানির ক্ষেত্রে নির্ভরশীল, তেমনি পানির ক্ষেত্রেও আমরা নির্ভরশীল একটি দুর্বল কাঠামোর ওপর। এখানে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট, যে রাষ্ট্র নিজের পানিব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে পারে না, সে আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও শক্ত অবস্থান নিতে পারে না। অর্থাৎ ভিতরের দুর্বলতা বাইরের টেবিলেও ধরা পড়ে।
এই তিনটি ইস্যু-যুদ্ধ, নারী, পানি। সবকিছুর ভিতরে একটি সাধারণ সূত্র আছে। সেটি হলো, ক্ষমতা এবং তার প্রদর্শন। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শব্দের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু সত্যের গভীরতা কমেছে। রাজনীতিতে আমরা দেখি-যে বেশি কথা বলে, সে বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু দৃশ্যমানতা সব সময় শক্তির প্রতীক নয়। অনেক সময় এটি একটি অভিনয়, একটি মঞ্চ, যেখানে বাস্তবতা আড়ালে থাকে।
ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই বিষয় দেখা যায়। নিয়ন্ত্রণকে আমরা যত্ন বলে চালাতে চাই, আর যত্নকে কখনো কখনো ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলি। যে সম্পর্ক যত বেশি শব্দে ভরা, সেটি অনেক সময় তত বেশি ভঙ্গুর। একটি পুরোনো কবিতার লাইন মনে পড়ে-‘যা বলা যায় না, সেটাই সত্য।’ রাজনীতিতেও অনেক সময় সত্যটি উচ্চারণ করা হয় না, বরং সেটি নীরবতার ভিতরে থাকে।
আমরা এখন এমন এক সময়ের মধ্যে আছি, যেখানে সবাই দৌড়াচ্ছে-ক্ষমতার জন্য, প্রভাবের জন্য, স্বীকৃতির জন্য। কিন্তু সব দৌড়ই প্রয়োজনীয় নয়। কখনো কখনো থেমে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। কারণ সত্যিকারের শক্তি দখল করে রাখার মধ্যে নয়, ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও প্রকাশ পায়। যে জানে কখন থামতে হয়, সে-ই আসলে সবচেয়ে শক্তিশালী।
এই চারটি গল্প-দূরের যুদ্ধ, নারীর অদৃশ্য ক্ষমতা, নদীর রাজনীতি এবং নীরবতার শক্তি-আসলে একই সুতায় গাঁথা। এটি আমাদের সময়ের গল্প, যেখানে আমরা একদিকে অস্থিরতার ভিতরে বেঁচে আছি, আর অন্যদিকে স্থিতিশীলতার খোঁজ করছি। আমরা দূরের যুদ্ধকে দেখি খবর হিসেবে, নারীর উপস্থিতিকে দেখি অর্জন হিসেবে, নদীর সংকটকে দেখি আলোচনার বিষয় হিসেবে, আর নীরবতাকে দেখি দুর্বলতা হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো, এই চারটিই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
একটি বিষয় এখন পরিষ্কার হয়ে উঠছে, আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট বাইরের নয়, ভিতরের। আমরা এখনো প্রতিক্রিয়াশীল, প্রো-অ্যাকটিভ নই; আমরা এখনো কাঠামো বদলাই না, কেবল পরিস্থিতি সামলাই। ফলে প্রতিটি সংকট আমাদের কাছে নতুন মনে হয়, অথচ তার শিকড় অনেক পুরোনো। এই সময়টা তাই কেবল বিশ্লেষণের সময় নয়, এটি পুনর্বিবেচনার সময়। আমাদের অর্থনীতিতে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হতে হবে, আর সবচেয়ে বড় কথা-শব্দের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে সত্যের পাশে দাঁড়াতে হবে।
কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার জিডিপিতে নয়, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায়; শুধু তার সামরিক শক্তিতে নয়, তার নৈতিক অবস্থানে। আমরা যদি এখনো বুঝতে না পারি যে কখন দৌড়াতে হয়, আর কখন থামতে হয়-তাহলে আমরা হয়তো চলতে থাকব, কিন্তু কোথাও পৌঁছতে পারব না। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটিই, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো অনেক সময় নীরব থাকে। আর সেই নীরবতার ভিতরেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

































