| |
  • প্রচ্ছদ
  • মুক্তমত
  • সংকট থেকে সমাধানের পথে গ্যাস-বিদ্যুৎ
  • সংকট থেকে সমাধানের পথে গ্যাস-বিদ্যুৎ

    Icon
    কামরুল হাসান নাফিজ
    প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৩ অপরাহ্ন

    বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সম্পর্ক সরাসরি। চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় সংকটও বাড়ছে। তাই প্রশ্ন একটাই—এই সংকট থেকে বের হওয়ার বাস্তব পথ কী?

    বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা আনুমানিক ৩,৮০০–৪,০০০ MMCFD। দেশীয় উৎপাদন প্রায় ২,৬০০–২,৮০০ MMCFD; LNG আমদানিসহ মোট সরবরাহ প্রায় ৩,০০০–৩,২০০ MMCFD। অর্থাৎ গ্যাসে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।

    বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোচ্চ সময়ে চাহিদা প্রায় ১৬,৫০০–১৭,০০০ মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ প্রায় ১৬,০০০–১৬,৫০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি। ফলে স্পষ্ট—সমস্যা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা নয়; জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন, সিস্টেম লস, অপচয় ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বড় প্রশ্ন।

    তিন মাসে পুরো জ্বালানি সংকট দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে লোডশেডিং ও peak-hour ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

    ১. বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র সর্বোচ্চ ব্যবহার:
    জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যায় বন্ধ থাকা সক্ষম কেন্দ্রগুলো দ্রুত সচল করতে হবে। নতুন বড় কেন্দ্রের চেয়ে বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগানোই হবে দ্রুততম সমাধান।

    ২. গ্যাসের জরুরি ব্যবস্থাপনা:
    যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র কম গ্যাসে বেশি বিদ্যুৎ দিতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাসের অপচয় ও অবৈধ সংযোগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

    ৩. Peak-hour Load Management:
    সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বড় শিল্পের কিছু লোড off-peak সময়ে স্থানান্তরে Time-of-Use Tariff ও প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে।

    ৪. দ্রুত Rooftop Solar:
    সরকারি ভবন, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে দ্রুত সৌর প্যানেল স্থাপন করে দিনের সময়ের গ্রিড চাপ কমানো সম্ভব।

    ৫. অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো:
    Smart Meter, real-time monitoring এবং feeder-level analysis ব্যবহার করে বিদ্যুৎ চুরি ও অস্বাভাবিক সিস্টেম লস শনাক্ত করতে হবে।

    ৬. Energy Efficiency:
    অপ্রয়োজনীয় AC ও lighting নিয়ন্ত্রণ, LED এবং energy-efficient motor/AC ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। যে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়, সেটিই সবচেয়ে সস্তা নতুন বিদ্যুৎ।

    ৭. IPP ও Captive Power কাজে লাগানো:
    সক্ষম বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দ্রুত গ্রিডে যুক্ত করতে হবে—তবে অবশ্যই স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায়।

    তিন মাসের জরুরি ব্যবস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি National Energy Plan।

    দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়াতে হবে। স্থল ও সমুদ্রভাগে আধুনিক seismic survey ও exploration জোরদার করা জরুরি।

    একই সঙ্গে Solar, Wind ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারি ও শিল্প ভবনে rooftop solar এবং সম্ভাবনাময় উপকূলীয় এলাকায় wind power-এর বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা উচিত।

    রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।

    ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থা হতে হবে—

    Nuclear + Renewable + Smart Grid + Energy Storage + Energy Efficiency

    অর্থাৎ একটি উৎসের ওপর নির্ভরতা নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ Energy Mix।

    বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপব্যবহার, দুর্নীতি, বিদ্যুৎ চুরি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করতে হবে। IPP ও বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বচ্ছ চুক্তি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

    কারণ জনগণের অর্থে তৈরি বিদ্যুৎব্যবস্থায় জনগণের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

    বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণ, পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ ব্যবহার এবং সুশাসন—সবকিছুর সমন্বয়েই টেকসই সমাধান সম্ভব।

    আগামী তিন মাসে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত “নতুন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি নয়, বিদ্যমান ব্যবস্থার সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার।” আর আগামী দশকের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থা।

    “বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়—অপচয় কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুশাসনের মাধ্যমে প্রতিটি মেগাওয়াটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই আসল সমাধান।”

    লেখকঃ কামরুল হাসান নাফিজ, তরুণ রাজনীতিবিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

    আরও পড়ুন