মোঃ শরীফুল ইসলাম
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকে (AQI) বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় অবস্থান করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণ কেবল মানুষের ফুসফুসে বা স্থানীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে না, বরং এটি সার্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে একটি দ্বিমুখী বিপজ্জনক চক্রে (Feedback Loop) আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
দূষিত বাতাসে থাকা পিএম ২.৫ (PM2.5), কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং ইটভাটা ও যানবাহন থেকে নির্গত ব্ল্যাক কার্বন বা কায়ালি ঢাকা শহরের স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু সংকটের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে তুলছে।
বায়ুদূষণ কীভাবে জলবায়ুকে প্রভাবিত করছে?
১. ‘উষ্ণ নগর দ্বীপ’ (Urban Heat Island) প্রভাব: ধূলিকণা, বিষাক্ত গ্যাসে ঢাকা ঢাকার আকাশ তাপ আটকে রাখে। ফলে রাতেও শহরের তাপমাত্রা আশানুরূপ কমে না, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি হওয়া দাবদাহকে আরও তীব্র করে তোলে।
২. বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণ পরিবর্তন: বায়ুতে অতিরিক্ত বস্তুকণা মেঘের ঘনীভবন প্রক্রিয়া এবং স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের গতিপথ ব্যাহত করে। এর ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি বা দীর্ঘ খরা দেখা দেয়।
৩. ব্ল্যাক কার্বনের কুফল: ইটভাটা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি থেকে নির্গত স্বল্পমেয়াদী জলবায়ু দূষক (Short-lived Climate Pollutants) গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়নে দ্রুত ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
ঢাকার বায়ু দূষণ ও জলবায়ুর এই নিবিড় সম্পর্ক এবং সমাধান নিয়ে মতামত দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই পরিবেশ গবেষক ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ:
১, ড. আতিক রহমান (পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, নির্বাহী পরিচালক – বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ) বলেন,
”ঢাকার বায়ুদূষণকে কেবল একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখার দিন শেষ।
বায়ুতে থাকা বিষাক্ত গ্যাস ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বায়ুমণ্ডলের ওপর স্তরে জমে এক ধরণের তাপ-আটকানো স্তর তৈরি করছে, যা ঢাকার তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অতিরিক্ত স্থানীয় উষ্ণায়ন বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের আঞ্চলিক প্রকোপকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
আমরা যদি অবিলম্বে যানবাহনের ধোঁয়া, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ ও ইটভাটার দূষণ কমাতে না পারি, তবে ঢাকা একটি বসবাসঅযোগ্য অতি-উষ্ণ নগরীতে পরিণত হবে।”
২, অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জমান মজুমদার (বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র – ক্যাপস-এর চেয়ারম্যান) বলেন, ”বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বর্ষার পর ঢাকার আবহাওয়ায় বায়ুদূষণের মাত্রা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত বায়ুকণার কারণে সূর্যের আলো ঠিকমতো মাটিতে পৌঁছাতে না পেরে বায়ুমণ্ডলেই আটকা পড়ে, যা জলবায়ুর সাময়িক অনিয়ম ও শুষ্ক ঋতুকে দীর্ঘায়িত করে। ফলে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং খরা ও বায়ুদূষণ একে অপরকে বাড়িয়ে তুলতে থাকে। এই চক্র ভাঙতে হলে অবিলম্বে নগর ভিত্তিক সমন্বিত ‘ক্লীন এয়ার অ্যান্ড ক্লাইমেট একশন প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা করতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অবৈধ ইটভাটা পুরোপুরি বন্ধ করা। মেগা প্রকল্প ও ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলক ঢেকে কাজ করা এবং ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো।
শহরের সবুজ বেষ্টনী বৃদ্ধি এবং জলাশয় রক্ষা করা। পরিচ্ছন্ন শক্তি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।































