| |
  • প্রচ্ছদ
  • সম্পাদকীয়
  • অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি
  • অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি

    Icon
    মোস্তফা কামাল
    প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

    অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, আর্থিক চাপ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, নিত্যপণ্যের দামের উল্লম্ফনে সাধারণ মানুষের মতো ব্যবসায়ীরাও অতিষ্ঠ। ব্যবসা-বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণ প্রবাহ হ্রাস এবং আমদানি-রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীরা সয়ে আসছেন টানা প্রায় দেড় বছর।

    শিল্প-বাণিজ্যে চেপে বসা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে একদিকে সরকারি আয়োজন যেমন দৃশ্যমান নয়, রাজনৈতিক প্রস্তুতিও বোধগম্য নয়। নির্বাচনমুখী দলগুলোর ব্যবসা-বিনিয়োগসংক্রান্ত কিছু কথাবার্তা থাকলেও প্রস্তুতি অস্পষ্ট।

    রাজস্ব ও মূল্য সংযোজন কর বিষয়ক কথা শোনার সময়ও হয় না সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের। দেশের উৎপাদনশিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ভ্যাট ও কর কাঠামোকে যুক্তিসংগত করার দাবি উপেক্ষিত। শিল্প এলাকাগুলোয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই করার আলাপ তামাদির খাতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা শোনার মতোও যেন কেউ নেই।

    এ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আভাস নেই। নেই শিল্প-বিনিয়োগ শক্তিশালী করতে সুষ্ঠু উৎপাদন ও কার্যক্রমের কথাবার্তাও।

    ভ্যাট ও কর কাঠামো সহজ, উদ্যোক্তাবান্ধব করার প্রতিশ্রুতি দূরে থাক, এ বিষয়ক কিছু আশাবাদী কথা দেওয়ার লোকেরও অভাব পড়ে গেল? পণ্য টেস্টিং এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে উদ্যোক্তাবান্ধব করা, নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপের সরকারি সহায়তা নিশ্চিতের ওয়াদা এখনো আসেনি কোনো দল থেকে। ব্যবসা-বাণিজ্যকে টেকসই ও সমৃদ্ধ করতে একটি মসৃণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর অত্যন্ত জরুরি।

    এর চর্চা ও প্রক্রিয়া নির্বাচনের আগে থেকেই শুরু করা সম্ভব। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগে আস্থা এবং বহির্বিশ্বে দেশের ইমেজ বাড়াতে এ চর্চার বিকল্প নেই। গণতন্ত্র সিন্ডিকেট ভাঙতে, প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং ভোগ্যপণ্যসহ সব ক্ষেত্রে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সহায়ক। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী—উভয়ের জন্যই তা কল্যাণকর। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত ও বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠা হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে।

    বিশ্বায়নে কোনো দেশে আইনের শাসন ও স্বচ্ছতা থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পান। বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। একটি গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল হয়, যা রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সেই চর্চা ও ওয়াদার আবশ্যকতা রয়েছে।
    অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকেও এতে সায় থাকা আবশ্যক। ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা চান এর একটা বাতাবরণ তথা নমুনা। ব্যবসায়ীদের টিকে থাকতে হয় ঘামে-শ্রমে-উৎপাদনে। সেই সঙ্গে নিয়োগ করা জনবলের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে। ব্যথা-বেদনায়ও কাঁদতে পারে না। সক্ষমতা দেখাতে হয়। সরকারের অবস্থা এর বিপরীতে। খরচে টান পড়লে এখানে-ওখানে হাত বসায়। ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণের একটি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেই রাখে। ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা মধ্যবিত্তের সঞ্চয়পত্রে হাত দিতেও সরকারের বাধে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সঞ্চয়পত্র থেকে নিট দুই হাজার ৩৬৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। গত অর্থবছর শেষে যেখানে নিট ঋণ ঋণাত্মক ছিল ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি। গত তিন অর্থবছর ধরে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর চেয়ে বিক্রি কম ছিল। যে কারণে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। সব মিলিয়ে গত অক্টোবর শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪০ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। যদিও বিক্রির তুলনায় সঞ্চয়পত্র বেশি ভাঙানো হয়।

    সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে এবং মেয়াদের আগে ভাঙানো অংশ বাদ দিয়ে নিট বিক্রির হিসাব করা হয়। একসময় ব্যাংকের তুলনায় উচ্চ সুদসহ বিভিন্ন কারণে বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হতো। সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ কমাতে তখন কয়েক দফায় সুদহার কমানো হয়। ট্রেজারি বিল, বন্ডের সুদ অনেক বাড়লেও সঞ্চয়পত্রে কমেছে। সব মিলিয়ে গত তিন অর্থবছর ধরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমছে। অন্যদিকে ট্রেজারি বিল, বন্ডে ব্যক্তি বিনিয়োগ কয়েক গুণ বেড়েছে। তবে গত কয়েক মাস ধরে আবার বিল, বন্ডের সুদহার কমতির দিকে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাই আছে সরকারের। গত ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা নিয়ে ফেলেছে সরকার।

    গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে ৯৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত নিয়েছে ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। মুখে নানা বাহার থাকলেও ভেতরে ভেতরে সরকারও অর্থনৈতিকভাবে শক্তপোক্ত অবস্থানে নেই। উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকিতে ভুগছে সরকারি প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন আর্থিক অনুপাতের নির্দিষ্ট মানদণ্ড ব্যবহার করে ঝুঁকি মূল্যায়নে চরম বাজে অবস্থায় আছে অন্তত ৪২টি প্রতিষ্ঠান। ২৩০টি স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কিছু সেবামূলক কাজ বাদ দিয়ে আর্থিক কাজে পরিচালিত ১০১টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার দেনা ও সম্ভাব্য দায় বিবরণী বিশ্লেষণে তা ধরা পড়েছে সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষায়ও।

    উচ্চ ঝুঁকি, মধ্যম ঝুঁকি, কম ঝুঁকি ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা এসব প্রতিষ্ঠান টানতে গিয়ে এদিকে-ওদিকে হাত বাড়ায় সরকার। ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগ নেই। মানতে হয় বাস্তবতা। চলতে হয় দেশের বিদ্যমান রাজনীতি-অর্থনীতির রসায়নে। তাই মসৃণ গণতান্ত্রিক রুপান্তরের অধীর অপেক্ষায় ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা। শুধু রাজনৈতিক নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও সেই মসৃণতা অপরিহার্য। এর পরই না ব্যবসা-বিনিয়োগে টিকে থাকা ও প্রসারের ভিত্তি। তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ভালো হওয়ার অপেক্ষা ও প্রত্যাশা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রায় ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। সেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হিসেবে বলা হয়েছে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি খাতকে।

    পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত নতুন অর্থনৈতিক সংকলনের তথ্য ও আভাস এমনই। সেখানে অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক পালাবদল অর্থনীতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্কতাও রয়েছে। আর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হলে এবং নতুন সরকার ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত ও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতি ফের গতিশীলতা পাবে, যা ট্রমাগ্রস্ত বা কোমায় কাঁতরানো ব্যবসায়ীরা মাথা ঠুকে বলে আসছেন গত প্রায় দেড় বছর ধরে।

    লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
    ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

    আরও পড়ুন