বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ আছে— “ঘরের শত্রু বিভীষণ”। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে বিএনপির জন্য। কারণ, বাইরের প্রতিপক্ষের চেয়ে দলটির জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেতরের বিভাজন, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণ।
নির্বাচনে “কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা” একটি পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এই কৌশলটি বিএনপির ক্ষেত্রে উল্টো ফল দিচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের একটি সুসংগঠিত ও নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে, যা সাধারণত ভাঙে না। অন্যদিকে বিএনপির ভোট এখন ভেঙে যাচ্ছে নিজেদের ভেতরেই।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ না হন, তাহলে বিএনপির মোট ভোটের প্রায় ১৫–২০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। এই ভোট বিভাজনের সুযোগটাই জামায়াত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষায় যাকে বলা যায়—জামায়াতের জন্য এটি হয়ে উঠছে “সোনায় সোহাগা”।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত। এই তিন বিভাগ মিলিয়ে মোট ১০৮টি আসনের মধ্যে ১০১টিতেই জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে, যা তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতির গভীরতা ও কৌশলগত আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে খুলনা বিভাগে। ৩৬টি আসনের মধ্যে ১১টিতে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়িয়ে গেছে, যা যে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। রংপুর বিভাগেও ৩৩টি আসনের মধ্যে অন্তত ৪টি আসনে একই ধরনের সমস্যা দৃশ্যমান। এই বিদ্রোহ যদি শেষ মুহূর্তে সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে ফলাফল বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনের রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে অঙ্ক অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়। জামায়াত যেখানে ভোট একত্রিত করতে পারছে, সেখানে বিএনপি পড়ছে ভোট বিভাজনের ফাঁদে। বাস্তবতা হলো—ভেতরের ঐক্য ছাড়া বড় কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
বিএনপি কি সময়মতো নিজেদের ঘরের কাঁটা সরিয়ে ভোট ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে,
নাকি এই বিভাজনই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে আগামীর রাজনৈতিক সমীকরণ।
লেখকঃ তরুণ রাজনীতিবিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

































