৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • ফিচার
  • রাত নামলেই পাল্টে যায় সদরঘাটের দৃশ্য
  • রাত নামলেই পাল্টে যায় সদরঘাটের দৃশ্য

    Icon
    নিজস্ব প্রতিবেদক
    প্রকাশ: ৮ মে ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ণ

    ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সদরঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দরও। দিনে এখানে মানুষের ঢল নামে, ভিড় জমে হাজারো যাত্রী আর নৌযানের। কিন্তু রাত নামলেই এই চেনা দৃশ্য পাল্টে যায়। কোলাহল থেমে গেলে উন্মোচিত হয় আরেকটি নীরব বাস্তবতা একটি অদৃশ্য শহর, যেখানে বসবাস করেন খেয়া নৌকার মাঝিরা। যাত্রী পারাপারের তীব্র ব্যস্ততায় দিন কাটানো সেসব জীবনগুলোর সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে।

    সদরঘাটের অধিকাংশ মাঝির স্থায়ী বসতি ঢাকার বাইরে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পটুয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখে, জীবিকার তাগিদে তারা রাজধানীতে এলেও এখানে তাদের কোনো স্থায়ী আশ্রয় গড়ে ওঠে না। কারণ একটাই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। নগরের উচ্চ ব্যয় তাদের নাগালের বাইরে। ফলে নৌকাই হয়ে ওঠে তাদের বাসস্থান। সেখানেই খাওয়া, বিশ্রাম সবকিছু।

    ঢাকায় একটি সাধারণ বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ-পানি ও দৈনন্দিন খরচ মেটানো তাদের আয় দিয়ে প্রায় অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে নৌকাকেই তারা বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। নৌকার পাটাতনই তাদের বিছানা, আকাশই ছাদ। নৌকার পাটাতনেই তারা ঘুমায়। সদরঘাটের নৌকায় এভাবে বসবাস করা মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদরঘাটের মাঝিদের ঘুমানো রুটিনটা স্বাভাবিকত সমাজের আর দশজনের মতো হয় না। মাঝিদের মধ্যে কেউ কেউ রাতভর নৌকা চালান, আবার কেউ কেউ চালান শুধু দিনের বেলায়। যারা রাতভর নৌকা চালান, তারা ফজরের আযানের পরে সাধারণত ঘুমাতে যান। আবার কেউ নৌকা চালানো শুরু করেন ফজরের পর থেকে।

    দিনভর মানুষ পারাপারের পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাঝিরা ফিরে যান না কোনো ঘরে। নদীর পাড়ে কিংবা পল্টনের কাছে কোনো পিলারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে নৌকা বেঁধে, সেখানেই তারা শরীর এলিয়ে দেন। এই ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্যতামূলক এক বিশ্রাম। নৌকা যেন ভেসে না যায়, সেজন্য মাঝিরা দড়ি দিয়ে পিলার বা ঘাটের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। তারপর সেখানেই শুয়ে পড়েন। কোনো নিরাপত্তা ছাড়া, থাকে না ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও।

    মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার ব্যস্ততার মধ্যে তারা গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান। এই ঘুমও স্বস্তির নয়, আরামদায়ক নয়। খোলা আকাশের নিচে, গন্ধ আর অনিরাপত্তার মধ্যে কাটানো সময়। নদীর ঢেউ, লঞ্চের শব্দ, হর্ন, মানুষের আনাগোনা সব মিলিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ঘুম তাদের জন্য বিলাসিতা।

    মাঝি শরফুদ্দিন পিন্টু বলেন, ‘দিন শেষে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। দুই বেলা রাস্তার পাশের সস্তা হোটেল থেকে খাই। মলত্যাগের জন্য পাবলিক টয়লেট বা লঞ্চের টয়লেট ব্যবহার করি। কিন্তু ঘুমানোর আলাদা কোনো জায়গা নেই। নৌকার ওপরই শুয়ে পড়ি। শুরুতে কষ্ট হতো, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে শরীর ক্লান্ত থাকলে পাটাতনেই ঘুম চলে আসে।’

    বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দীর্ঘদিন ধরেই দূষণের জন্য সমালোচিত। নদীর চারপাশে জমে থাকা শিল্পবর্জ্য, নর্দমার পানি এবং আবর্জনা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই পরিবেশেই দিন-রাত কাটাতে হয় মাঝিদের।

    সবচেয়ে বড় ভোগান্তির একটি হলো মশার উপদ্রব। নদীর পানি দূষিত, আশপাশে জমে থাকা আবর্জনা আর নর্দমার কারণে মশার উপদ্রব এখানে ভয়াবহ। রাতে এই মশার আক্রমণ মাঝিদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ। মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে যায় বারবার। তবুও কোনো প্রতিকার নেই। অনেক মাঝি জানান, মশার কয়েল বা ওষুধ ব্যবহারের সামর্থ্যও সবসময় থাকে না।

    আরও পড়ুন