বর্ষপঞ্জির বাংলা শেষ মাস চৈত্র। ঋতুচক্রের ধারায় এ সময়টিকে ধরা হয় বসন্তের শেষভাগ ও গ্রীষ্মের আগমনের বার্তা নিয়ে আসা এক বিশেষ সময় হিসেবে। প্রকৃতিতে দেখা দেয় পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ, আর মানুষের মনে জাগে নতুন বছরের আগমনের অপেক্ষা। বাংলা সাহিত্যে চৈত্রের এই সময়টিকে নানা রূপে তুলে ধরেছেন কবি ও সাহিত্যিকরা।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত গান,‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’এই আহ্বানে যেন পুরোনোকে ঝরিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানোর বার্তাই তুলে ধরেছেন। সেই প্রস্তুতির আবহই যেন শুরু হয় চৈত্রের প্রথম দিন থেকে।
ফাল্গুনের রঙিন আবেশ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, সামনে এসে দাঁড়ায় গ্রীষ্মের উষ্ণতা। দুপুরের রোদ কিছুটা তীব্র হলেও সকাল ও বিকেলে হালকা বাতাসে টের পাওয়া যায় বসন্তের শেষ স্পর্শ। গাছে গাছে নতুন পাতার সবুজ, আবার কোথাও শুকনো পাতার ঝরাপাতায় তৈরি হয় এক ভিন্ন সৌন্দর্য। চৈত্র শুধু একটি মাসের শুরু নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। গ্রামবাংলায় এ সময়কে বলা হয় বছরের শেষ লগ্ন। কৃষিজীবী মানুষের কাছে এটি পুরোনো হিসাব গুছিয়ে নেওয়ার সময়, আবার নতুন বছরের প্রস্তুতিরও সূচনা।
চৈত্র মাসজুড়ে গ্রামগঞ্জে বসে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা। নাগরদোলা, মাটির খেলনা, শোলার কাজ, পিঠা-পুলি কিংবা স্থানীয় খাবারের দোকান-সব মিলিয়ে মেলাগুলো হয়ে ওঠে আনন্দঘন মিলনমেলা। শিশুদের হাসি, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্মৃতিচারণে জমে ওঠে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণবন্ত রূপ। শহরেও চৈত্রের আবহ আলাদা করে অনুভূত হয়। বিভিন্ন বিপণিবিতানে শুরু হয় ‘চৈত্র সেল’।
বছরের শেষ মাস উপলক্ষে নানা ছাড়ে কেনাকাটা করতে ভিড় করেন ক্রেতারা। একই সঙ্গে শুরু হয়ে যায় নতুন বছরকে ঘিরে নানা প্রস্তুতিও। বাংলা সংস্কৃতিতে চৈত্র মানেই এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি, বিদায়ের সঙ্গে আগমনের সেতুবন্ধন। পুরোনো বছরকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি যেমন থাকে, তেমনি নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দও ধীরে ধীরে জমতে থাকে।
এই ঋতুবদলের মুহূর্তে চৈত্রের প্রথম দিন যেন মনে করিয়ে দেয়,সময় কখনও থেমে থাকে না। প্রকৃতি যেমন পুরোনো পাতা ঝরিয়ে নতুনকে জায়গা করে দেয়, তেমনি মানুষও পুরোনো ক্লান্তি ঝেড়ে নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
আর সেই অপেক্ষার শেষ প্রান্তেই দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব পহেলা বৈশাখ। তাই চৈত্রের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় নতুন বছরের আগমনী সুর।
লেখকঃ মো; শরীফুল ইসলাম , সিনিয়র সাংবাদিক।

































