জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিশেষ করে যেসব দেশ নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আমদানিনির্ভর দেশে জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে চাল, গম, সয়াবিন ও ভোজ্যতেলের মূল্যে বড় ধরনের লাফ দেখা গেছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলো বৈশ্বিক এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি সামলাচ্ছে। ডলার-সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে অনেক দেশের সরকার, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের চতুর্থ দিনে অনুষ্ঠিত ‘বিপর্যয়ের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা’ বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং এসব সংকটের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও করণীয় তুলে ধরেন আলোচকরা।
খাদ্য সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চরম তাপমাত্রা এবং অসময়ে বন্যা ও খরাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘এল নিনো’ ও তীব্র দাবদাহের কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষিউৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও থমকে গেছে। স্থানীয়ভাবে ফসলের দরপতনের কারণে বাজারগুলো বেশি পরিমাণে আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব ব্যাংকের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখন আর কেবল সাময়িক কোনো মানবিক সংকট নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। চড়া সুদের হার, সীমিত বাজেট এবং বৈদেশিক ঋণের চাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক সংকট তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভর করে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন সক্ষমতা ও সেচ সুবিধা বাড়াতে হবে।
নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে।
খাদ্যসংকটের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় বাজেটে আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
দ্রুত সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ না নিলে এই খাদ্য সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।




























