নোবেল পুরস্কারের সোয়া শ’ বছরেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ ইতিহাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের এই সর্বোচ্চ সম্মাননা অর্জনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল ও বিস্ময়কর। বিশ্বমঞ্চে পারিবারিক মেধার এই অনন্য উত্তরাধিকার মূলত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে দেখা গেছে।
নোবেল ফাউন্ডেশনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত মোট ৭টি পিতা-পুত্র জুটি নোবেল জয়ের এই অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন।
বিজ্ঞান ও গবেষণায় ইতিহাস গড়ে তোলা সেই সফল পিতা-পুত্রদের অর্জন তুলে ধরা হলো:
১. উইলিয়াম হেনরি ব্র্যাগ ও উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ (পদার্থবিজ্ঞান):ইতিহাসের সবচেয়ে অনন্য উদাহরণ হলো ব্র্যাগ পরিবার। ১৯১৫ সালে এক্স-রে কেলাসবিদ্যার (X-ray crystallography) ওপর গবেষণার জন্য পিতা উইলিয়াম হেনরি ব্র্যাগ এবং পুত্র উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
একই বছর ও একই বিষয়ে পিতা-পুত্রের একসাথে নোবেল জয়ের ঘটনা ইতিহাসে এটিই একমাত্র। মাত্র ২৫ বছর বয়সে নোবেল পেয়ে লরেন্স ব্র্যাগ সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী হিসেবেও রেকর্ড গড়েন।
২. জে জে থমসন ও জর্জ প্যাজেট থমসন (পদার্থবিজ্ঞান):ইলেকট্রন যে একটি ‘কণা’ (particle)—তা প্রমাণের জন্য ১৯০৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান পিতা জে জে থমসন। অন্যদিকে, তাঁরই পুত্র জর্জ প্যাজেট থমসন ১৯৩৭ সালে ইলেকট্রনের ‘তরঙ্গধর্ম’ (wave nature) প্রমাণ করে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল অর্জন করেন।
৩. নিলস বোর ও অগে বোর (পদার্থবিজ্ঞান):কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও পরমাণুর গঠন ব্যাখ্যার জন্য বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী নিলস বোর ১৯২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি পুত্র অগে বোর ১৯৭৫ সালে পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে উপ-পারমাণবিক কণার গতিপ্রকৃতি আবিষ্কারের জন্য একই বিভাগে নোবেল অর্জন করেন।
৪. কার্ল ম্যান সিগবান ও কাই সিগবান (পদার্থবিজ্ঞান):সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল ম্যান সিগবান ১৯২৪ সালে এক্স-রে বর্ণালীবিদ্যায় অবদানের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল লাভ করেন। তাঁর পুত্র কাই সিগবান ১৯৮১ সালে উচ্চ-রেজোলিউশন ইলেকট্রন স্পেকট্রোস্কোপি উন্নত করার স্বীকৃতি হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান।
৫. হ্যান্স ভন ইউলার-চেলপিন ও উলফ ভন ইউলার (রসায়ন ও চিকিৎসা):পিতা হ্যান্স ভন ইউলার-চেলপিন ১৯২৯ সালে এনজাইমের গাঁজন প্রক্রিয়ার গবেষণার জন্য রসায়নে নোবেল পান। অন্যদিকে তাঁর পুত্র উলফ ভন ইউলার স্নায়ুতন্ত্রের নিউরোট্রান্সমিটার (নোরপাইনফ্রিন) সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৭০ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল লাভ করেন।
৬. আর্থার কর্নবার্গ ও রজার কর্নবার্গ (চিকিৎসা ও রসায়ন):ডিএনএ (DNA) সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য ১৯৫৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান পিতা আর্থার কর্নবার্গ। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে সুকেন্দ্রিক কোষে জেনেটিক তথ্যের ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে রসায়নে নোবেল লাভ করেন তাঁর পুত্র রজার কর্নবার্গ।
৭. সুনে বার্গস্ট্রম ও সোভান্তে প্যাবো (চিকিৎসাবিজ্ঞান):সুইডিশ বায়োকেমিস্ট সুনে বার্গস্ট্রম প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন সংক্রান্ত গবেষণার জন্য ১৯৮২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ২০২২ সালে বিলুপ্ত হোমিনিন ও মানব বিবর্তনের জিনোম আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল লাভ করেন তাঁর পুত্র সোভান্তে প্যাবো।
বিজ্ঞান ও গবেষণায় এক প্রজন্মের রক্ত ও মেধার ধারাবাহিকতা কীভাবে মানবজাতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে, এই পিতা-পুত্রদের নোবেল বিজয়ের ইতিহাস তার এক অনুপম নিদর্শন।






























