ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি)। জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয় পেতে পারে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ৪৬টি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩টি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল ৪টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৭টি আসনে জয়ী হতে পারেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে ২২টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের থ্রিডি সেমিনার হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
ইএএসডির দাবি, সাড়ে ৪১ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত এই জরিপটি আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে হওয়া জরিপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় নমুনাভিত্তিক গবেষণা। অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হায়দার তালুকদার।
তিনি জানান, দেশের সব ৩০০টি সংসদীয় আসনে প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট (পিএসইউ) পদ্ধতি অনুসরণ করে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। মোট ৪১ হাজার ৫০০ জন উত্তরদাতার তথ্য ‘কোবো টুলবক্স’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। গত ১৮ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারী মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। দেশের জনমিতিক ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে সারা দেশে মোট ২ হাজার ৭৬৬টি পিএসইউ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রতিটি পিএসইউ থেকে ধারাবাহিকভাবে ১৫টি পরিবার নির্বাচন করা হয় এবং প্রতিটি পরিবার থেকে একজন যোগ্য উত্তরদাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যাতে তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতিগত ও পক্ষপাতহীন থাকে। গ্রামীণ এলাকার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন এবং শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে ওয়ার্ডকে ক্লাস্টার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, ফলে গ্রাম ও শহর উভয় এলাকার মানুষের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ হাজার ৫০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে ২৬ হাজার ৫৬০ জন পুরুষ, যা মোট অংশগ্রহণকারীর ৬৪ শতাংশ। নারী উত্তরদাতার সংখ্যা ১৪ হাজার ৯২২ জন, অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ। বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ।
৩১ থেকে ৫০ বছর বয়সী উত্তরদাতার হার ছিল ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ছিলেন ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ছিলেন ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা ছিলেন ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী ছিলেন ৫ শতাংশ এবং ছোট ব্যবসায়ী ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। কৃষি ও গ্রামীণ শ্রমজীবী খাত থেকে অংশগ্রহণ ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত ছিলেন ১৯ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা, আর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
জরিপের ফলাফলে রাজনৈতিক পছন্দের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বিএনপির প্রতি জনসমর্থনের চিত্র উঠে এসেছে। মোট ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর বিপরীতে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এনসিপি পেয়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ সমর্থন। অন্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির জনসমর্থন ৪ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা তুলনামূলক বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়। নারী ভোটারদের মধ্যে ৭১ দশমিক ১ শতাংশ বিএনপিকে সমর্থন করছেন। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে বিএনপি জোটের প্রতি সর্বোচ্চ সমর্থন দেখা গেছে চট্টগ্রামে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সিলেটে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে বরিশালে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং খুলনায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে জামায়াত জোট শক্ত অবস্থানে রয়েছে। উত্তরবঙ্গের রংপুরে জাতীয় পার্টি ৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে।
শামীম হায়দার তালুকদার জানান, আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের ১৫ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাকি ৫ শতাংশ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, আসন্ন নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার নিজ নিজ আসনে বিএনপি প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। সামগ্রিকভাবে এই জরিপ দেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং একটি বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা বিএনপির দিকেই ঝুঁকে আছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চান, এমন প্রশ্নে সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের পক্ষে মত দিয়েছেন ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা, আর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের পক্ষে মত দিয়েছেন ২ শতাংশ। এ বিষয়ে মত প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা।































