মোঃ শরীফুল ইসলাম
ফুটবল স্রেফ একটি ৯০ মিনিটের খেলা নয়—তা আবার নতুন করে প্রমাণ করেছেন লিওনেল মেসি। পায়ে বল জড়িয়ে সবুজ গালিচায় তিনি যে রূপকথা রচনা করেছেন, তাকে শুধুই ক্রীড়াশৈলী বললে ভুল হবে; তা ছিল বিশুদ্ধ শিল্পকলা, ছিল লক্ষ-কোটি মানুষের অন্তহীন আবেগের মেলবন্ধন। সেই সোনালী রূপকথার শেষ পাতাটি উল্টানোর সময় এসে গেছে।
ফুটবল বিধাতা যাকে সৃষ্টি করেছিলেন বল পায়ে আনন্দ ছড়ানোর জন্য, সেই ‘স্বপ্নের নায়ক’ লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক কিংবা পেশাদার ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্ন ফুটবলের এক যুগাবসানকে নির্দেশ করে।
রোজারিওর গলিপথ থেকে বিশ্বজয়ের সর্বোচ্চ শিখর—মেসির এই পথচলা যেমন নাটকীয়, তেমনই মহাকাব্যিক। ফুটবলের আদি ও অকৃত্রিম যে রূপ—যেখানে গতি, সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও কল্পনা একবিন্দুতে এসে মিলে যায়—মেসি ছিলেন তার চূড়ান্ত নিদর্শন।
মাইকেল অ্যাঞ্জেলো যেমন ক্যানভাসে ছবি আঁকতেন বা মোৎসার্ট সুর সৃষ্টি করতেন, মেসি ঠিক সেভাবেই বল পায়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চুরমার করে ফুটবলের ক্যানভাসে এঁকেছেন একের পর এক আশ্চর্য নিদর্শন।
প্রতিপক্ষের তিন-চারজন ডিফেন্ডারকে অনায়াসে পরাস্ত করা, অসম্ভব সব কোণ থেকে গোল করা কিংবা চোখের পলকে নিখুঁত পাস বাড়ানো—মেসির প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক একটি মহোৎসব।
তবে মেসির এই অমরত্বের যাত্রা কোনো গোলাপ বিছানো পথ ছিল না। একের পর এক আন্তর্জাতিক ফাইনাল হারানো, নিজের দেশের সমর্থক ও সংবাদমাধ্যমের কঠোর সমালোচনা, এমনকি অবসাদের অতলে ডুবে ক্ষণিকের বিদায়—সব বাধা পেরিয়ে তার ফিরে আসার গল্পটি এক অবিসংবাদিত নায়ক হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২২ সালের কাতারের মরুপ্রান্তরে তিনি যখন সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল যেন নিজে ঋণমুক্ত হয়েছিল। মারাদোনার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের নামে আলাদা এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে মেসি প্রমাণ করেছেন—ধৈর্য, অধ্যবসায় আর নম্রতা দিয়ে কীভাবে অধরাকে স্পর্শ করতে হয়।
মেসির বিদায় কেবল একজন ফুটবলারের বুটজোড়া খুলে রাখার গল্প নয়; এটি একটি প্রজন্মের শৈশব ও কৈশোরের সোনালী স্মৃতির বিদায়। বিগত দুই দশক ধরে বিশ্বজুড়ে যেসব তরুণ ফুটবলকে ভালোবেসেছে, লালন করেছে, তাদের অনেকের কাছেই ফুটবল এবং মেসি শব্দ দুটি ছিল সমার্থক।
বিশ্বফুটবলে পরিসংখ্যান আসবে, নতুন কোনো নক্ষত্র হয়তো আবার মেসির হাজারো রেকর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে, তবে মেসি যে রোমাঞ্চ ও আবেগ বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছেন, তা চিরকাল অনন্য হয়ে থাকবে।
কিংবদন্তিরা কখনো সত্যিই বিদায় নেন না। সবুজ ঘাসের প্রতি ইঞ্চি, গ্যালারির প্রতিটি উল্লাস আর লক্ষ-কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে লিওনেল মেসি বেঁচে থাকবেন এক চিরন্তন মহাকাব্য হয়ে। ধন্যবাদ, ফুটবলের স্বপ্নের নায়ক; ফুটবল আপনাকে সবসময় মনে রাখবে।
লেখকঃ ফুটবল প্রেমী, সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক, “এশিয়ান দর্পণ”।


























