যখন M825-সিরিজের ১৫৫ মিমি আর্টিলারি প্রজেক্টাইল বিস্ফোরিত হয়, তখন এর ভেতরে থাকা সাদা ফসফরাসযুক্ত ফেল্টের টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আকাশে একটি বিশেষ ধরনের ‘গাঁটের মতো’ ধোঁয়ার আকৃতি তৈরি করে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর গবেষকরা জানান, এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধোঁয়ার আকৃতির মাধ্যমেই তারা নিশ্চিত হতে পেরেছেন যে ইসরায়েল আবারও দক্ষিণ লেবাননের ওপর এই বিতর্কিত অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে করে যুদ্ধের আইন ভঙ্গের অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক এই অধিকার সংগঠনটি জানায়, তারা আটটি ছবি যাচাই ও অবস্থান নির্ধারণ করেছে, যেখানে দেখা যায় দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমর শহরের আবাসিক এলাকায় সাদা ফসফরাসযুক্ত গোলাবারুদ আকাশে বিস্ফোরিত হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলো ঘটেছে গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের হামলার শুরুর দিকে। এরপর আরও অনেক ভিডিও সামনে এসেছে, যেগুলোতে দক্ষিণ লেবাননের ওপর সাদা ফসফরাস ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ইসরায়েলি বাহিনী যখন ওই এলাকা থেকে প্রায় ৮ লাখ মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে, তখন অনেক ঘটনাই হয়তো নথিভুক্ত হয়নি।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনারা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে, যদিও তারা ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী রাস্তা, পেট্রল পাম্প, সেতু ও চিকিৎসা কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যাতে দক্ষিণ লেবাননকে দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়।
সাদা ফসফরাস একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা আর্টিলারি শেল, বোমা ও রকেটে ব্যবহার করা হয়। এটি অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলেই জ্বলে ওঠে, প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পুড়ে এবং প্রচুর ধোঁয়া তৈরি করে।
সামরিক বাহিনী সাধারণত এটি ব্যবহার করে ধোঁয়ার আড়াল তৈরি করতে, যাতে সৈন্যদের চলাচল গোপন রাখা যায়, লক্ষ্য চিহ্নিত করা যায় বা রাতের অন্ধকারে এলাকা আলোকিত করা যায়।
সামরিক আইনজীবীরা বলেন, এ ধরনের ব্যবহার বৈধ। তবে বেসামরিক এলাকায় এর ব্যবহার অত্যন্ত বিতর্কিত এবং অনেকের মতে অবৈধ। কারণ এটি আগুন লাগায়, ভয়াবহ দগ্ধ সৃষ্টি করে এবং বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়ায়।
নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির স্থপতি ও পিএইচডি গবেষক আহমদ বেইদাউন জানান, তিনি অক্টোবর ২০২৩ থেকে নভেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর প্রায় ২৫০টি সাদা ফসফরাস ব্যবহারের ঘটনা নথিভুক্ত ও মানচিত্রে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, এই সংখ্যা আসলে আরও বেশি হতে পারে।
তার গবেষণায় দেখা যায়, ব্যবহারের ৩৯ শতাংশ হয়েছে আবাসিক এলাকায়, ১৭ শতাংশ কৃষিজমিতে এবং ৪৪ শতাংশ বন বা খোলা জায়গায়। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দৃশ্যমানতা বাড়ানোর জন্য মাঠঘাট পুড়িয়ে দেয়, যাতে মানুষ বা হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা গাছপালার আড়ালে লুকাতে না পারে।’
লেবাননের অলাভজনক সংস্থা পাবলিক ওয়ার্কস স্টুডিওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাদা ফসফরাস ব্যবহার করে দক্ষিণ লেবাননের ২০০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৭৩ হেক্টর ঘন বনভূমি, যেখানে ইউক্যালিপটাসসহ ওক ও পাইন গাছের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল।
সাদা ফসফরাস মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে এবং পরে কৃষকরা জমি খুঁড়লে হঠাৎ আবার জ্বলে উঠতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষ করে যদি মানুষজন আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারে।
এছাড়া এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বারবার সাদা ফসফরাস ব্যবহারের ফলে মাটিতে ফসফরিক অ্যাসিড ও ক্যাডমিয়াম, সিসা ও দস্তার মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু জমা হয়। এর ফলে মাটির জীববৈচিত্র্য কমে যায়, উর্বরতা নষ্ট হয় এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, ইয়োহমরে সাদা ফসফরাস অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তারা মন্তব্য করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘সাদা ফসফরাসযুক্ত ধোঁয়ার গোলা এবং অন্যান্য ধোঁয়ার গোলার মধ্যে চাক্ষুষ মিল থাকতে পারে, তাই শুধুমাত্র দৃশ্য দেখে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’
গত সপ্তাহে জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যাননও এই অভিযোগের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমরা বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। এজন্যই আমরা লিতানি নদীর দক্ষিণে থাকা মানুষদের উত্তরে চলে যেতে বলেছি।’
বেইদাউন বলেন, তার গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সাদা ফসফরাস ব্যবহার করছে হয়তো মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার একটি উপায় হিসেবে, যাতে সীমান্তের লেবানন অংশে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করা যায়।
তিনি আরও বলেন, ‘এটা মূলত মাঠ পুড়িয়ে দেওয়ার একটি ব্যবহারিক উপায়। আমার মনে হয়, উদ্দেশ্যটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটাই, মাটি পুড়িয়ে ফেলা।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান






























