সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এ ঘটনায় গত ২৯ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দাখিল করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
দুদকে দেওয়া অভিযোগপত্রে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামের বানান ভুল করে ‘মো. শাহাবুদ্দিন’ লেখা হয়েছে। একই সঙ্গে তার রাষ্ট্রপতি পরিচয় উল্লেখ না করে তাকে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। চলতি বছরের ২৪ জুলাই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পরই ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকে আবেদন করা হয়।
অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদকের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। মো. সাহাবুদ্দিন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) বিভাগে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালে তিনি জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের পর ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসীন আলী ব্যাংকের পক্ষে দুদকে অভিযোগটি জমা দেন। দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে এ বিষয়ে কথা হলে দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযোগে ইসলামী ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক থাকাকালে মো. সাহাবুদ্দিনসহ তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য জালিয়াতির মাধ্যমে ‘সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন। পরে ওই ঋণের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
যা বলা হয়েছে অভিযোগে
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ‘সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড’ নামে একটি ‘দুর্বল প্রতিষ্ঠানের’ ঋণসীমা জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়ানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির ঋণসীমা ১০০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরবর্তীসময়ে ওই ঋণের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগে আরও বলা হয়, অ্যাননটেক্স গ্রুপের ইউনুস বাদলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের অনুকূলে অবৈধভাবে ঋণ বরাদ্দ পাইয়ে দিতে ব্যবসায়ী এস আলম ভূমিকা রাখেন। তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. সাহাবুদ্দিন, ব্যাংকের সাবেক তিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল মাওলা, আব্দুল হামিদ মিয়া ও মাহবুব উল আলমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন এবং এতে আর্থিকভাবে লাভবান হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘চারটি অডিট ফার্মের’ মাধ্যমে ঘটনাটি তদন্ত করা হয়েছে। ওই তদন্তে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম এবং অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই দুদকে অভিযোগ করা হয়েছে।
যেভাবে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গঠিত পরিচালনা পর্ষদে তিনি যুক্ত হন।
ইসলামী ব্যাংকের অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময়ই ‘সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড’-এর ঋণসীমা ১০০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান।
যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকটির অভিযোগ, তারা হলেন—
সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড ও গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে আলহাজ মো. ইউনুস বাদল, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এ বি এম শামসুল হাসান, একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সালেহা শাহিন, পরিচালক উম্মে সালমা শারমিন, গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামিলা আক্তার সীমা, এলিট সকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কবির হোসাইন, সরকার ফারজানা ইসলাম, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ মোহাম্মদ সাইফুল আলম (মাসুদ) ওরফে আলম এস আলম এবং প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধি মেজর জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন।
এ ছাড়া এক্সেল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেডের সদস্য প্রতিনিধি ও ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য প্রফেসর ডা. মো. সিরাজুল করিম, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য প্রফেসর মো. নজমুল হাসান, প্রফেসর মো. কামাল উদ্দিন, এবিসি ভেনচার্স লিমিটেডের সদস্য ও প্রতিনিধি এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য মো. জয়নাল আবেদীন, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক সৈয়দ আবু আসাদ, প্রফেসর ড. কাজী শাইদুল আলম, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক মো. সোলাইমান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আবদুল হামিদ মিয়া, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মওলা এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইনভেস্টমেন্ট কমিটির কনভেনর মোহাম্মদ কায়সার আলী।
অভিযোগে আরও রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, ড. তানভীর আহমেদ, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক প্রফেসর ড. মো. সালেহ জহুর, সাবেক পরিচালক মো. কামরুল হোসেন, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক প্রফেসর ড. মো. ফয়সাল আলম, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহবুদ্দিন, সাবেক চেয়ারম্যান মো. আহসানউল আলম, পরিচালক প্রফেসর (ডা.) কাজী শহীদুল আলম, সাবেক পরিচালক খোরশেদুল আলম, মো. নাসির উদ্দিন, সাবেক ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তাহের আহমেদ চৌধুরী, এফসিএস ও সাবেক ডিএমডি জি. ইউ. এম. হাবিব উল্লাহ, সাবেক ডিএমডি মোহাম্মদ সাব্বির, সাবেক ডিএমডি মিফতা উদ্দিন, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.এফ.এম. কামাল উদ্দিন এবং সাবেক ডিএমডি কাজী মো. রেজাউল করিম।

























