বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বছর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে।
আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বা ৫ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ কমেছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ কমে আসার এ চিত্র দেখা যায়। সোমবার (২ মার্চ) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের খেলাপি ঋণের এ তথ্য দেন।
তিনি জানান, ঋণ পুনঃ তফসিলকরণ ও পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ সুবিধা অনেকেই কাজে লাগিয়েছেন। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরাও ঋণ নিয়মিত করার জন্য ডাউন পেমেন্ট দিয়েছেন।
ফলে খেলাপি ঋণ কমে এসেছে। জানা গেছে, খেলাপি ঋণ পরিশোধে প্রথমে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলেরও সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে অনেকেই সহজ শর্তে খেলাপি ঋণ পরিশোধ করায় ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কমে আসে।
প্রপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ বা ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার প্রয়োজন ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা।
কিন্তু ব্যাংকগুলো ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে সক্ষম হয়। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বরে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রভিশনের বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যাংকগুলো অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হলেও তা গোপন রাখা বা কমিয়ে দেখানোর সুযোগ নিত। ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য সামনে আসতো না। সরকার পতনের পর অনিয়মে জড়িত প্রভাবশালী অনেক ব্যবসায়ী পালিয়েছেন। কেউ কেউ কারাগারে আছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ি করা হয়। ফলে একদিকে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র সামনে এসেছে, আরেক দিকে নিয়ম করা হয়েছে সঞ্চিতি ঘাটতি রেখে ২০২৫ সালের জন্য কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না। যে কারণে বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফশিল বা আদায় জোরদার করেছে ব্যাংকগুলো। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। বর্তমান সরকারের সময়ে খেলাপিদের বিষয়ে কঠোর হলে এ ঋণের পরিমাণ দিন দিন আরো কমবে বলে আশা করছেন তারা।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের চাপ সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৪৪.৪৪ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে ২৮.২৫ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকে ৪.৫১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৯.৭৪ শতাংশ।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণই এই অবস্থার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, তিন মাসে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমলেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। কারণ খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশই মন্দ বা ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ, অর্থাৎ আদায়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
































