হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জোর করে একটি নতুন পথ খোলার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ দুই দেশের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, গত জুনে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) তেহরানকে এই কৌশলগত নৌপথের ট্রানজিট রুট ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের অধিকার দেয়।
আরাগচি বলেন, যেকোনো নতুন রুটের বিষয়ে ওয়াশিংটনের উচিত ছিল তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করা। তিনি আরও জানান, এ ধরনের বিরোধ সমাধানের জন্য দুই পক্ষ একটি সরাসরি যোগাযোগের লাইন খুলতে সম্মত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার পারদ কিছুটা কমার লক্ষণ দেখা দেওয়ার মধ্যেই আরাগচি এই মন্তব্য করলেন। এর আগে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে কয়েক সপ্তাহের হামলা তাদের অন্তর্বর্তী চুক্তিটিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল।
আল জাজিরা জানায়, শনিবার রাতে বড় বড় ইরানি শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘কোনো প্রত্যক্ষ হামলা’ হয়নি। এটি ছিল টানা প্রায় দুই সপ্তাহের রাতের হামলার ধারাবাহিকতার ব্যতিক্রম। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেছেন, ‘ইরান একটি শান্ত রাত কাটিয়েছে।’
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে ‘ব্যাপক’ হামলা চালানোর আগের হুমকি থেকে কিছুটা নমনীয় হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেছেন, সেই হামলা এখন আর প্রয়োজন নাও হতে পারে।
শুক্রবার রাতে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরানি কর্মকর্তারা) এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে; তারা একটি চুক্তি করতে পারলে খুশি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না যে তারা প্রস্তুত… তবে আমি শুনতে ইচ্ছুক।’
ইরানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। আল জাজিরা জানায়, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং তেহরান এখনো সেগুলো পর্যালোচনা করছে। তবে তাদের (ইরানিদের) অবস্থানের মধ্যে ‘মৌলিক পার্থক্য’ এবং গভীর ‘অবিশ্বাসের’ কারণে এখনো ‘বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি’।
হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধের একটি মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এই প্রণালী দিয়ে চলাচল তদারকি করার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা জাহাজগুলোকে তাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে ও নির্ধারিত রুটগুলো ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে বারবার বলে আসছে, ইরান এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এ অবস্থার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে নিয়ম লঙ্ঘন করার অভিযোগে ইরানি বাহিনী যখন জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালাচ্ছে, তখন মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি বন্দরগুলোতে নিজেদের অবরোধ আবার জোরদার করেছে।
শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স আল জাজিরাকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ট্যাংকারকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করে দিয়েছে, যা বারবার মার্কিন অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল এবং মার্কিন সতর্কতা উপেক্ষা করেছিল।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করে, গত ১৪ জুলাই অবরোধ পুনরায় শুরু করার পর থেকে তারা মোট ১২টি জাহাজকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং অন্য একটি জাহাজকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করেছে।
অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাচি উলফগ্যাং পুসতাই বলেছেন, কূটনীতি, অবরোধের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক পদক্ষেপ– এই সব ধরনের কৌশলই ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য এই তিনটিকে একটি সমন্বিত উপায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মানে হলো, প্রথমত এবং সর্বাগ্রে এখন হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া।’
পুসতাই বলেন, ‘পুরো যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে ইরানিদের ইচ্ছাকে সহজতর করার জন্য এক ধরনের গরম ও ঠান্ডা পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। তাই এক রাতে তাদের ওপর বোমা বর্ষণ করা হয়, আবার অন্য রাতে বোমা বর্ষণ করা হয় না।’
ইয়েমেনে ইরানের হুতি মিত্ররাও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। তারা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাবেল-মান্দেব প্রণালীতে নৌচলাচল ব্যাহত করছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যৌথ বাহিনী কমান্ড শুক্রবার ইয়েমেনের হুতি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা শহরে হামলার দাবি করেছে। তারা জানিয়েছে, বোমাবর্ষণের লক্ষ্যবস্তু হওয়া সব স্থানই ‘লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুমকির সঙ্গে জড়িত ছিল’।
শনিবার সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, দেশটির লোহিত সাগরের উপকূলীয় কৌশলগত তেল স্থাপনা সমৃদ্ধ ইয়ানবু এবং জিজান প্রদেশে একাধিকবার সাইরেন বেজে ওঠে। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, ওই এলাকায় সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোতে তাদের দল হামলা চালিয়েছে।
সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, সাইরেনগুলো বাজানোর কারণ ছিল ‘সম্ভাব্য বিপদ’, যা পরে কেটে গেছে। তবে তারা এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
সূত্র: আল জাজিরা























