পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ‘বাংলা একাডিমী’তে চলছে ৭ দিন ব্যাপি বৈশাখি মেলা। রাতের অন্ধকার পেরিয়ে দিগন্তে উঁকি দেয় নতুন ভোরের সূর্য। তার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় বাংলা সনের নতুন বছর ১৪৩৩।
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ছায়ানট। ১৯৬৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পহেলা বৈশাখে প্রভাতী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে লালন করে আসছে, তারা এবারও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে স্বাগত জানাল সুরেলা ও ভাবগভীর উপস্থাপনায়।
এবারের প্রতিপাদ্য ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। যার অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবমুক্তির চেতনা। লোকগান, পল্লীগীতি ও সম্মেলক পরিবেশনায় ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’, ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘এসো মুক্ত করো’, ‘সেদিন আর কত দূরে’—এসব গানে গানে উচ্চারিত হয় সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মুক্তচিন্তার আহ্বান। পাশাপাশি আবৃত্তিতে উঠে আসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ বিভিন্ন কবির ভাবনা। সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম সবুজ।
প্রায় ২০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে সকাল থেকে বয়ে চলে এই সংগীত, কবিতা ও সংস্কৃতির সম্মিলিত ধারা। শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই মিলে যেন তৈরি করে এক আত্মিক বন্ধন, যেখানে প্রজন্মের ব্যবধান মুছে গিয়ে তৈরি হয় এক সাংস্কৃতিক ঐক্য।
এই দীর্ঘ আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। তবে অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত তাৎপর্য ধরা পড়ে শেষ পর্বে, যখন বক্তব্য দেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। তার বক্তব্যে উঠে আসে সময়ের অস্থিরতা, সহিংসতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির চিত্র।
সারওয়ার আলী বলেন, যে সংগীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম ও মুক্তির সঙ্গী, সেই সংগীতকেই বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে। সমাজে বাড়ছে অসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় তৈরি হচ্ছে ভয়। বিশ্ব পরিস্থিতির অস্থিরতার কথাও তুলে ধরে তিনি বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
উৎসবমুখর শিল্পকলা একাডেমি
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে থাকছে পাঁচ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমির এ আয়োজনে থাকছে সাংস্কৃতিক উৎসব, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলা। শিল্পকলা একাডেমির এই বর্ষবরণ উৎসবে থাকছে ঢাকঢোল, লাঠিখেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, লাটিম খেলা, জারিগান, সারিগান, পটগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা, কবিগান, গাজির গান, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া গান, পুতুলনাট্য, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বৈশাখী মেলার মতো নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ আয়োজন।
১৩ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
প্রথম দিনের এ আয়োজনে জাতীয় চিত্রশালা ভবনের গ্যালারি-৪-এ লোকশিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় ‘ধামাইল নৃত্য’। এরপর ছিল ‘লোকসংগীত: জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠ’। সর্বশেষ একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে প্রদর্শিত হয় যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’। এটি পরিবেশন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি রেপার্টরি যাত্রা দল।
পহেলা বৈশাখে বিকেল ৪টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করা হবে নতুন বছরকে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ। একাডেমি প্রাঙ্গণে ঢাকঢোল বাদনের মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতে থাকবে শতকণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং ‘এসো হে বৈশাখ’। এ ছাড়া পরিবেশিত হবে কবিগান, গাজীর গান, গম্ভীরা ও বাউল গান। থাকবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা।
অন্যদিকে একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে আজ অনুষ্ঠিত হবে স্বপ্নদলের বহুল আলোচিত নাটক ‘চিত্রাঙ্গদা’র দুটি প্রদর্শনী। একটি বিকেল ৫টা ও পরেরটি সন্ধ্যা ৭টায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরায়ত সৃষ্টি কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র গবেষণাগার নাট্যরীতিতে নির্দেশনা দিচ্ছেন জাহিদ রিপন। রবীন্দ্রনাথ মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা-উপাখ্যান অবলম্বনে ১৮৯২-এ কাব্যনাট্যরূপে এবং ১৯৩৬-এ নৃত্যনাট্যরূপে ‘চিত্রাঙ্গদা’ রচনা করেন। স্বপ্নদলের ‘চিত্রাঙ্গদা’ প্রযোজনাটি নির্মিত হয়েছে কাব্যনাট্যের পাণ্ডুলিপি অবলম্বনে। ‘চিত্রাঙ্গদা’ প্রযোজনার গ্রন্থিকরা হলেন সোনালি, জুয়েনা, শিশির, শ্যামল, অর্ক, নিশক, জেবু, সুমাইয়া, সামাদ, নিসর্গ, আলী, বিপুল, হাসান, বিমল, শফিক, জাওয়াদ, মাসুদ, অনিন্দ্য প্রমুখ। প্রযোজনাটির মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা করেছেন ফজলে রাব্বি সুকর্ণ।
১৫ এপ্রিল জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজনের প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএনপির সহ-সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক সাঈদ সোহরাব। সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের (জাসাস) কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হেলাল খান। সঞ্চালনায় থাকছেন সংগঠনটির সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকন। এ আয়োজনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের (জাসাস)-এর পরিবেশনায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংগীত পরিবেশন করবেন ইথুন বাবু। রাজবাড়ীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হবে ‘অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী’।
১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ দিন উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী। অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন। ওই দিন সাংস্কৃতিক পর্বে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবেশনায় থাকবে ‘জাতি বৈচিত্র্যে বৈশাখী উৎসব’।
































