গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবিত এই আইনে গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে বা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আইনের উদ্যোক্তা। লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে মন্ত্রিসভা খসড়াটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন এই আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এটি গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এ গুমের অপরাধের জন্য সাধারণভাবে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
আইনটিতে তদন্ত ও বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত এবং পরবর্তী ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের অধিকার রক্ষায় আইনে যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা হবে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে; তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র কর্তৃক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও খোঁজ না মিললে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য ‘গুম সনদ’ দেওয়া হবে।
এছাড়া নতুন এই আইনে সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও এতে যুক্ত করা হয়েছে।























