| |
  • প্রচ্ছদ
  • পর্যটন
  • পর্যটন উন্নয়ন হলে অর্থনৈতিক মডেল হত সোনাদিয়া
  • পর্যটন উন্নয়ন হলে অর্থনৈতিক মডেল হত সোনাদিয়া

    Icon
    নিজস্ব প্রতিবেদক
    প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:০৯ পূর্বাহ্ন

    কক্সবাজারের মহেশখালীর উত্তর-পশ্চিমে সাগরের মাঝে নয় বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট সোনাদিয়া দ্বীপ। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বন, বালুকাবেলা ও সমুদ্রজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও অবহেলায় দ্বীপবাসীর মৌলিক চাহিদা পূরণে এখনও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

    সমুদ্রের তলদেশ থেকে কয়েকশ বছর আগে জেগে ওঠা সোনাদিয়া এক সময় ছিল উর্বর মাটি, ম্যানগ্রোভ বন ও সামুদ্রিক সম্পদের কেন্দ্র। পর্যটন উন্নয়ন হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি কমিউনিটি-বেসড অর্থনৈতিক মডেল হতে পারতো।

    কিন্তু দীর্ঘ অবহেলায় দ্বীপটি প্রাথমিক সেবার বাইরে যেতে পারেনি।
    শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও নিরাপদ পানির ঘাটতি এখনো প্রকট। ফলে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দ্বীপবাসীসহ দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিও। দ্বীপে বসবাস করেন প্রায় দুই হাজার মানুষ।

    অর্থনীতি চলে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে-চিংড়ি পোনা, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ ও শুকনো মাছ প্রস্তুত করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। নোনা পানির কারণে কৃষি প্রায় অনুপস্থিত। নারী-পুরুষের সংখ্যা সমান হলেও নারীদের অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। অবকাঠামো ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা তাদের পিছিয়ে রাখছে।

    চরের বাসিন্দা মঞ্জুরা বেগম (৩৫) বলেন, আমাদের এখানে কাজের তেমন কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় হাসপাতাল নেই। অসুখ হলে নৌকায় যেতে হয়, কিন্তু জোয়ার থাকলে যাওয়া যায় না। প্রতিদিনই আমাদের জীবনে সংগ্রাম। দ্বীপে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষকও সীমিত।

    পঞ্চম শ্রেণির পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ঝড়-বৃষ্টিতে নৌকা চলাচল বন্ধ থাকায় নিয়মিত স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্যসেবার পরিস্থিতিও একই। কমিউনিটি ক্লিনিক নেই, জরুরি চিকিৎসার জন্য মহেশখালী যেতে হয়। নিরাপদ পানি-সংকটে পুষ্টির ঘাটতি শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

    শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে, যার মধ্যে ওরিয়েন্টাল ডার্টার-এর মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিও রয়েছে। ম্যানগ্রোভ বন, কচ্ছপের ডিম ফোটানোর উপকূল ও সমুদ্রের ইকোসিস্টেম একে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। পরিবেশবিদ ড. সায়েম আহমেদ বলেন, সোনাদিয়া শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। উন্নয়ন মানে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে মানুষকে টিকিয়ে রাখা।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনাদিয়ার অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হতে পারে কমিউনিটি-বেসড ট্যুরিজম বাস্তবায়নের মাধ্যমে। পর্যটন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, পর্যটন মানে শুধু হোটেল নয়। স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি এবং জীবনধারার সঙ্গে পর্যটকের সংযোগই আসল ট্যুরিজম। স্থানীয়রা গাইড, রেস্টহাউস মালিক ও পণ্য সরবরাহকারী হলে অর্থ এখানেই ঘুরবে।

    সমীক্ষা অনুযায়ী, এই পদ্ধতিতে প্রতি মাসে ৫০০ পর্যটক যদি দ্বীপে আসে, তবে স্থানীয় অর্থনীতিতে মাসে অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রবাহিত হবে। যা বর্তমান আয়ের প্রায় তিনগুণ। নারীরা হোমস্টে পরিচালনা, হস্তশিল্প তৈরি ও স্থানীয় খাবার সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হতে পারেন। জেলে কমিউনিটি নেতা আজিজুল হক (৪২) বলেন, আমরা চাই উন্নয়ন, কিন্তু আমাদের মাটি বা মাছ ধ্বংস যেন না হয়।

    দ্বীপের হস্তশিল্পে সম্ভাবনা রয়েছে শামুক, ঝিনুক ও শুকনো মাছের ব্যবহার করে গহনা ও সুভেনিয়র তৈরিতে। সঠিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের জন্য ব্র্যান্ডিংয়ের একটি নতুন দিক হতে পারে বলেও মন্তব্য বিশিষ্টজনদের।

    পর্যটন ও বাসস্থান উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক অবকাঠামো অপরিহার্য। মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, নিরাপদ নৌকা পরিষেবা, সোলার পাওয়ার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানীয় জলের ব্যবস্থা তৈরি হলে দ্বীপবাসীর জীবনমান উন্নত হবে। চরাঞ্চলের উপযোগী বাসস্থানের মডেল তৈরি করলে ঝড় ও জোয়ার প্রতিরোধ সম্ভব। এছাড়া সোনাদিয়ার সমুদ্র ও বালুকাবেলার বৈচিত্র্যও অনন্য। লবণাক্ত জল, টিডাল ফ্ল্যাটস, কচ্ছপের ডিম ফোটানোর উপকূল এবং ম্যানগ্রোভ বন পর্যটন ও সামুদ্রিক হস্তশিল্পের জন্য সহায়ক।

    অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, সঠিকভাবে পরিচালিত ইকো-ট্যুরিজম দ্বীপের আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়াতে পারে, যা দেশের সামুদ্রিক উৎপাদন ও জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, মনোযোগ না দিলে হারানো সুযোগ ও প্রাকৃতিক ক্ষতি দেশীয় অর্থনীতিতে অমূল্য ক্ষতি সৃষ্টি করবে।

    ড. সায়েম আহমেদ বলেন, প্রকৃতি-বান্ধব কটেজ, স্থানীয় খাবার, প্রশিক্ষিত গাইড-এসব মিলিয়ে সোনাদিয়া দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ইকো-ট্যুরিজম স্পট হতে পারে।

    শত অবহেলায়ও সোনাদিয়া হার মানেনি। কচ্ছপেরা এখনো রাতে ডিম ফোটায়, পাখিরা ভোরে উড়ে আসে, শিশুরা নৌকায় স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার টেকসই উন্নয়ন, নয়তো একদিন এই দ্বীপও হারিয়ে যাবে উন্নয়নের স্রোতে।

    সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপারে দাঁড়িয়ে সোনাদিয়া যেন এক নীরব আহ্বান জানাচ্ছে-আমাকে রক্ষা করো, আমি তোমাদেরই সম্পদ।

    আরও পড়ুন