| |
  • প্রচ্ছদ
  • Uncategorized
  • ধনী হওয়ার আগেই ভারতে বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • ধনী হওয়ার আগেই ভারতে বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা

    Icon
    আন্তর্জাতিক ডেস্ক
    প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৫ অপরাহ্ন

    দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাগত উদ্বেগ ছিল অতিরিক্ত জনসংখ্যা। কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলাচ্ছে। দেশটিতে জন্মহার কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে আসছে।

    ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডিসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ২০২৪ সালের দিকে ‘এজিং’ বা বার্ধক্যের দিকে এগোতে শুরু করেছে। ২০৪৯ সালের দিকে দেশটি ‘এজড’ বা বয়স্ক এবং ২০৬৫ সালের দিকে ‘সুপার-এজড’ বা অতি বয়স্ক দেশে পরিণত হতে পারে।

    অর্থাৎ, ‘বয়স্ক’ থেকে ‘অতি বয়স্ক’ পর্যায়ে যেতে ভারতের সময় লাগতে পারে মাত্র ১৬ বছর। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই সময় লাগবে প্রায় ১৯ বছর এবং ইন্দোনেশিয়ার ২৯ বছর। বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ হলো, জাপান ও ইউরোপের মতো অনেক দেশ ধনী হওয়ার পর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপে পড়েছিল। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি হলো—দেশটি পুরোপুরি ধনী হওয়ার আগেই দ্রুত বয়স্ক হয়ে যেতে পারে।

    ভারতে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মূল কারণ জন্মহার কমে যাওয়া। ১৯৫০ সালে বিশ্বে একজন নারীর গড় সন্তান সংখ্যা ছিল ৪ দশমিক ৯। বর্তমানে তা কমে প্রায় ২ দশমিক ২-এ দাঁড়িয়েছে। প্রতিস্থাপনযোগ্য জন্মহারের সীমা ধরা হয় ২ দশমিক ১।

    ভারতও এখন এই সীমার নিচে রয়েছে। অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যালের নেতৃত্বে করা একটি গবেষণায় ভারতের মোট প্রজনন হার ১ দশমিক ৯ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশকে বাদ দিলে তা আরও কমে ১ দশমিক ৬-এ দাঁড়ায়।

    গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতে বছরে জন্মের সংখ্যা কমে প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখে দাঁড়িয়েছে এবং কোনো সরকারি পদক্ষেপ না নিলেও তা আরও কমতে পারে। তবে এখনো ভারতের জনসংখ্যা বাড়ছে। এর কারণ হলো জনসংখ্যাগত গতিশীলতা—মানুষ আগের তুলনায় বেশি দিন বেঁচে থাকছেন, কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না।

    বিজ্ঞাপন

    মুডিসের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি দীর্ঘদিন ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু জন্মহার কমে যাওয়ার ফলে সেই সুবিধা ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমলে উৎপাদন ক্ষমতা কমতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের সংখ্যা কমে গেলে বাড়ি, গাড়ি, স্কুলসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদাও কমতে পারে।

    ফলে ভবিষ্যতে শুধু বেশি মানুষ কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করলেই হবে না। প্রতিটি কর্মীর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর ভারতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বার্ধক্যজনিত সবচেয়ে বড় চাপ আসতে পারে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং বয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ক্ষেত্রে।

    মুডিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলো যখন বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ সামলাতে শুরু করেছিল, তখন তাদের আয় তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু ভারতকে তুলনামূলক কম আয় থাকা অবস্থাতেই এই ব্যয় বহন করতে হতে পারে।

    জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ৪০ শতাংশের বেশি বয়স্ক মানুষ দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১৩৪ শতাংশ বাড়তে পারে। ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা বাড়তে পারে ২৭৯ শতাংশ।

    এমনকি ২০৪৬ সালের মধ্যে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভারতের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো। মুডিসের তুলনায় দেখা ১৯টি অর্থনীতির মধ্যে ভারতে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩২ শতাংশ—যা সবচেয়ে কম।

    অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন করে জনসংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে আরও বেশি নারীকে কর্মক্ষেত্রে আনা গেলে শ্রমশক্তির ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। এর জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, শিশুদের যত্নের সুযোগ এবং ভালো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    ভারতের সব অঞ্চলে জনসংখ্যার বার্ধক্য একই গতিতে ঘটবে না। বিহার ও উত্তরপ্রদেশে জন্মহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বয়স্ক মানুষের অনুপাত জাতীয় গড়ের নিচে থাকতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের অনেক রাজ্য দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। সেখানে কর্মক্ষম ১০০ জন মানুষের বিপরীতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি।

    অন্ধ্রপ্রদেশে জন্মহার ১৯৯২-৯৩ সালের ৩ থেকে কমে প্রায় ১ দশমিক ৫-এ নেমেছে। রাজ্যটি স্থানীয় নির্বাচনে দুই সন্তানের নীতি বাতিল করেছে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে।

    রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু বলেছেন, অনেক গ্রামে এখন শুধু বয়স্ক মানুষই থাকছেন, কারণ তরুণরা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতের পুরোনো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি এখন আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক নয়। পরিবার পরিকল্পনাকে স্বাস্থ্য, সন্তান জন্মের ব্যবধান এবং ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

    তবে শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে জন্মহার বাড়ানো সহজ নয়। বিভিন্ন দেশে নগদ সহায়তা, কর ছাড় ও শিশু পরিচর্যার সুবিধা দিয়েও জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো জন্মহার বাড়ানোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে আগেভাগেই একটি বয়স্ক সমাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

    মুডিসও বলছে, নীতি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে এই পরিবর্তনের প্রবণতা পুরোপুরি উল্টে দেওয়া কঠিন। অর্থাৎ, ভারত এখনো তুলনামূলক তরুণ দেশ। কিন্তু আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে দেশটি যদি উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও কর্মসংস্থানের কাঠামো শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে জনসংখ্যার বার্ধক্য বড় সংকটের বদলে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে।

    সূত্র: এনডিটিভি

    আরও পড়ুন