২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। সেই বেদনার রাত পেরিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। লিওনেল স্কালোনির ঘোষিত পরবর্তী তিন প্রীতি ম্যাচের দলে যেমন পুরোনোদের অনেকেই আছেন, তেমনি এসেছে বেশ কিছু নতুন মুখ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক রোমান ভেগা।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে প্রথমবারের মতো ডাক পেয়েছেন এই লেফট-ব্যাক। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর দলের পুনর্গঠনের শুরুতেই ভেগাকে সুযোগ দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন একটি বিকল্প তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছেন স্কালোনি।
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর কর্দোবায় বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে নতুন চক্র শুরু করবে আর্জেন্টিনা। এরপর ৩ অক্টোবর বুয়েনস এইরেসে খেলবে বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে। ৬ অক্টোবর এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচটি অবশ্য অন্য দুই ম্যাচের চেয়ে আলাদা গুরুত্ব বহন করবে। কারণ, ওই ম্যাচেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামার কথা লিওনেল মেসির।
তবে মেসির বিদায়কে ঘিরে যতটা আবেগ, স্কালোনির কাছে এই তিন ম্যাচ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ নতুন খেলোয়াড়দের পরখ করার জন্য। আর সেই তালিকায় ভেগার নামটিই সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করেছে।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে ভেগা একেবারে অপরিচিত নাম নন। তবে জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ে তার আবির্ভাবটা বেশ আকস্মিক। আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের একাডেমি থেকে উঠে আসা এই লেফট-ব্যাকের ক্যারিয়ার তাকে নিয়ে গেছে বার্সেলোনা বি দলে। এরপর ২০২৫ সালে তিনি যোগ দেন রাশিয়ার ক্লাব জেনিতে।
ভেগাকে দলে নিতে জেনিত নাকি ৯০ লাখ ডলার খরচ করেছে। এর মধ্যে খেলোয়াড়টির ৯০ শতাংশ স্বত্ব কিনেছে রুশ ক্লাবটি, আর আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্স পেয়েছে ৬৫ লাখ ডলার নিট। তবে ক্লাব ফুটবলে পথচলা যতই আলাদা হোক, আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে ভেগার সম্পর্ক নতুন নয়।
বয়সভিত্তিক দলে আগেই দেশটির জার্সি পরেছেন তিনি। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপেও খেলেছেন ভেগা। সেই দলে তার সতীর্থ ছিলেন ভ্যালেন্তিন বারকো ও অগুস্তিন জিয়াইয়ের মতো খেলোয়াড়রা। অর্থাৎ স্কালোনির নজরের বাইরে ছিলেন না ভেগা। সিনিয়র দলে তার ডাক পাওয়াকে তাই হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্তের চেয়ে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণের ফল হিসেবেই দেখা যায়।
বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার প্রস্তুতি দলেও ছিলেন অগুস্তিন জিয়াই। এবার তিনি আবার সিনিয়র দলে সুযোগ পেয়েছেন। আর ভেগার ডাক দেখাচ্ছে, রক্ষণভাগে পুরোনো নির্ভরতার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকেও ধীরে ধীরে জায়গা দিতে চাইছেন স্কালোনি।
বিশেষ করে লেফট-ব্যাক পজিশনে ভেগার অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপরই বেশি নির্ভরতা ছিল। নতুন চক্রে ভেগাকে সুযোগ দিয়ে স্কালোনি সেই জায়গায় ভবিষ্যতের বিকল্প তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগেই এবারের দলে পরিবর্তনের ছাপ সবচেয়ে বেশি। ডান দিকে নাহুয়েল মোলিনার সাত ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা থাকায় নতুন বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে স্কালোনিকে। সেই জায়গায় সুযোগ পেয়েছেন অগুস্তিন জিয়াই ও হুয়ান ফোইথ।
জিয়াই তরুণ সম্ভাবনার প্রতীক। অন্যদিকে ফোইথ ফিরেছেন অভিজ্ঞতা নিয়ে। ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী এই ডিফেন্ডার চোটের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি। সর্বশেষ দল ঘোষণার মাত্র চার দিন আগেও শারীরিক সমস্যায় পড়েছিলেন তিনি। এরপরও তাকে দলে রেখেছেন স্কালোনি।
আর ভেগার অন্তর্ভুক্তি রক্ষণভাগের পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তার সামনে এখন জাতীয় দলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ। শুধু রক্ষণেই নয়, আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগেও নতুনদের উপস্থিতি স্পষ্ট। অনূর্ধ্ব-২৩ পর্যায়ের চার খেলোয়াড় আবারও সিনিয়র দলের দরজায় ফিরেছেন। তারা হলেন ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো, হিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি, মাতিয়াস সুলে ও সান্তিয়াগো কাস্ত্রো।
মাস্তানতুওনো বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরেছিলেন। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে সীমিত খেলার কারণে স্কালোনির পরিকল্পনায় তার জায়গা কিছুটা পিছিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের দলে জায়গা হয়নি। এবার আবার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
প্রেস্তিয়ানি ২০২৫ সালে অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক করেন। এরপর ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগের বিতর্কিত ঘটনায় পাওয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে জাতীয় দলের বিবেচনা থেকে ছিটকে যান। বেনফিকায় সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাকে আবারও স্কালোনির পরিকল্পনায় ফিরিয়েছে।
মাতিয়াস সুলে ও সান্তিয়াগো কাস্ত্রো এখনো আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেকের অপেক্ষায়। সুলে এর আগে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে চিলির বিপক্ষে ম্যাচে বেঞ্চে ছিলেন। কাস্ত্রোও উরুগুয়ের বিপক্ষে মনতেভিদেওতে আর্জেন্টিনার জয়ে বদলি হিসেবে নামার বিকল্প ছিলেন।
এবারের প্রীতি ম্যাচগুলো তাদের সামনে সেই অপেক্ষার অবসানের সুযোগ এনে দিতে পারে। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে অবশ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের ঘটনার জেরে লেয়ান্দ্রো পারেদেস ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন। এনসো ফার্নান্দেসও ফাইনালের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার কিছু আগে লাল কার্ড দেখেছিলেন।
তিয়াগো আলমাদা পেয়েছেন এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা। ক্লাস ‘এ’ আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ হওয়ায় এসব ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার ম্যাচও কমবে। ফলে আর্জেন্টিনার জন্য এগুলো শুধু পরীক্ষামূলক ম্যাচ নয়, নিষেধাজ্ঞা শেষ করারও সুযোগ।
এই কারণেই আর্জেন্টিনার নতুন দলটিকে একই সঙ্গে দুটি গল্পের প্রতিনিধিত্বকারী বলা যায়। একদিকে বিশ্বকাপের পরের শাস্তি ও অনুপস্থিতি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের আগমন। নাহুয়েল মোলিনা ও লেয়ান্দ্রো পারেদেস নিষেধাজ্ঞায় বাইরে। তিয়াগো আলমাদার নিষেধাজ্ঞা তুলনামূলক ছোট।
চোট কাটিয়ে ফিরেছেন হুয়ান ফোইথ। আর রোমান ভেগার মতো নতুন মুখ জাতীয় দলের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। ডিফেন্সে অগুস্তিন জিয়াই ও ভেগা নিজেদের জায়গা পাকা করার সুযোগ পাচ্ছেন। আক্রমণে মাস্তানতুওনো, প্রেস্তিয়ানি, সুলে ও কাস্ত্রো নিজেদের প্রমাণের অপেক্ষায়।
আর এই পরিবর্তনের মাঝেই থাকছেন মেসি। ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ হওয়ার কথা। ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড আগস্টে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে তার ক্যারিয়ারে আছে ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া মেসিকে তার প্রাপ্য বিদায় জানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়দেরও মনুমেন্তালে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামলে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ম্যাচসংখ্যা দাঁড়াবে ২০৮। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১২৫ গোলের মালিকও তিনি। তবে মেসির বিদায়ের মুহূর্তেই আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের উত্থান শুরু হওয়াটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সেই নতুন যাত্রায় রোমান ভেগার মতো তরুণদের সামনে এখন নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ।
























