২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • Uncategorized
  • ভেঙে যাচ্ছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস
  • ভেঙে যাচ্ছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস

    Icon
    আন্তর্জাতিক ডেস্ক
    প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

    পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের এমন পরিণতি ঘটবে, তা অনেকেই কল্পনা করেননি। ভোটের ফলের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দলটি শুধু ভাঙেইনি, বরং কার্যত তিন টুকরো হয়ে গেছে—যেটিকে বিশ্লেষকরা ‘ইমপ্লোশন’ বা ভেতরে ভেতরে চৌচির হয়ে যাওয়া বলে বর্ণনা করছেন।

    তৃণমূলের এই নাটকীয় বিভাজন কেন ঘটল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা।

    ১. তৃণমূলের নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতি ও আদর্শগত শূন্যতা
    তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন বা মতাদর্শের অভাব চিরকালই ছিল। ১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল সিপিআইএম-কে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসা। মমতার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘পপুলিজম’ বা জনমোহিনী নীতি।

    কিন্তু বিজেপির মতো আদর্শিক ভিত (হিন্দুত্ববাদ) বা কংগ্রেসের মতো উদারপন্থী ভাবধারা না থাকায়, ভোটে হারার পরপরই তৃণমূল নেতাদের কাছে আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই ছিল না। পর্যবেক্ষকদের মতে, মমতা ব্যানার্জী দলটিকে নির্বাচন-কেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে বিস্তৃত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে পরাজয়ের গ্লানি সামনে আসতেই নেতৃত্বের একাংশ রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দলত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন।

    ২. বিজেপির কৌশলগত ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি
    তৃণমূলের এই বিপর্যয়কে কাজে লাগাতে বিজেপি কোনো কসুর করেনি। কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে, প্রশাসক মমতার চেয়ে বিরোধী নেত্রী মমতা বেশি শক্তিশালী। তাই বিরোধী পরিসরটি যাতে মমতা ব্যানার্জীর হাতছাড়া হয়, সেজন্য বিজেপি একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বিরোধী দল তৈরির ছক কষেছে।

    বিজেপির এই কৌশলের দুটি দিক ছিল। ১) রাজ্য স্তরে বিদ্রোহী বিধায়কদের ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আলাদা ব্লক গঠন করতে মদত দেওয়া, যারা সরকারের সমালোচনায় সরব। ২) কেন্দ্রীয় স্তরে লোকসভার এমপি-দের একাংশকে এনসিপিআই-এর ব্যানারে এনডিএ জোটে টেনে আনা, যাতে লোকসভায় সরকারের শক্তি ৩০০ ছাড়িয়ে যায়। অথচ, বিজেপি কৌশলে কাউকেই সরাসরি নিজ দলে যোগ দেওয়ায়নি, যা তৃণমূলের অন্দরে সৃষ্টি করেছে চরম অস্থিরতা।

    ৩. অভিষেক ব্যানার্জী ও অভ্যন্তরীণ কর্পোরেট সংস্কৃতি
    তৃণমূলের এই ভাঙনের পেছনে সবচেয়ে আলোচিত কারণ হলো অভিষেক ব্যানার্জীর নেতৃত্ব। দলের অভ্যন্তরে তাকে নিয়ে সৃষ্ট ক্ষোভই মূলত বিভাজনের পথ প্রশস্ত করেছে। তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নেতাদের অভিযোগ, অভিষেক দল পরিচালনায় যে ‘কর্পোরেট কায়দা’ ও ঘনিষ্ঠ বলয় তৈরি করেছিলেন, তা দলের নিচুতলার সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি করে।

    বিশেষ করে ‘আই-প্যাক’-এর মতো নির্বাচনী পরামর্শক সংস্থাকে দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসায় পুরনো নেতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। পাশাপাশি, অভিষেকের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ তার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিদ্রোহী নেতারা অভিষেককে সামনে রেখেই নিজেদের দলবদলের সাফাই গাইছেন, যা তৃণমূলের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে।

    একদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন ‘আসল তৃণমূল’ দাবিদার ব্লক, অন্যদিকে এনডিএ-মুখী বিদ্রোহী এমপি-দের গোষ্ঠী এবং সবশেষে মমতা ও অভিষেক ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন ‘কালীঘাট তৃণমূল’—এই তিন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েছে দলটি।

    এমন একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের এত দ্রুত ভেঙে পড়া ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

    সূত্র: বিবিসি বাংলা

    আরও পড়ুন