ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের জন্য একটি চুক্তি হওয়ার সময় ‘খুবই কাছাকাছি’। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া আরাগচির দেওয়া পোস্ট এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে আসা সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেত।
এটি ইঙ্গিত করছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যে সম্ভাব্য অগ্রগতির কথা বারবার বলছে, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারে। শুক্রবার গভীর রাতে ইরানের প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, এখনো কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
তিনি জানান, যে চুক্তির বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে তা দুটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপটি হবে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সূচনা হবে। প্রথম ধাপের অধীনে লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণসহ সব ধরনের হামলা বন্ধ করা হবে এবং নতুন করে কোনো আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
তিনি আরও জানান, দ্বিতীয় ধাপে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করার মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি যোগ করেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের এবং ওমানের সার্বভৌমত্বের অধীনেই থাকবে, তবে এর ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অতীতের চেয়ে ভিন্ন হবে।
আরাগচি সতর্ক করে বলেন, প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকটি এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি ইরানের গভীর অনাস্থা রয়েছে। বিশেষ করে পরমাণু আলোচনা চলাকালীন ট্রাম্পের প্রশাসন দুইবার আক্রমণ চালিয়েছিল।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে একটি রহস্যময় বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তা অবশ্যই রাখতে হবে। কোনো যদি, কিন্তু বা অজুহাত চলবে না। সামনে যে চুক্তির আশা দেখা যাচ্ছে, তা সফল করার জন্য এটিই একমাত্র পথ।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘যেমন বপন করবে, তেমনই ফসল পাবে।’ এদিকে শুক্রবার হোয়াইট হাউজের এক সিনিয়র কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি, তবে ‘আমরা খুব কাছাকাছি আছি’।
ওই কর্মকর্তা জানান, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করা হবে। তবে এর বিনিময়ে ইরানকে অবশ্যই তাদের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে এবং সমস্ত পরমাণু সরঞ্জাম হস্তান্তর করতে হবে।
তিনি আরও পরিষ্কার করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরান কোনো সুবিধা পাবে না। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও তহবিল ছাড়ের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করবে ইরান চুক্তি অনুযায়ী শর্তগুলো মেনে চলছে কি না তার ওপর।
ওই কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরই বিভিন্ন টেকনিক্যাল বা কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের আগের একটি বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, প্রাথমিক চুক্তি হলেই ইরানের সব আটকে থাকা সম্পদ ছাড় পাবে না।
শুক্রবার দিনের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কিছু সংবাদমাধ্যমের খবরের সমালোচনা করেন। ওই প্রতিবেদনে কথিত চুক্তির শর্তগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল, যা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো জানানো হয়নি।
ট্রাম্প সম্ভবত আইআরএনএর একটি প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে চুক্তির সাতটি প্রধান পয়েন্ট তুলে ধরা হয়েছিল। তাতে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরান কোনো নতুন ছাড় দিচ্ছে না। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছিল, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের কিছু সম্পদ ছাড় করা হবে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা এই তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি গুটিয়ে ফেলা, পরমাণু সরঞ্জাম ধ্বংস করা ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত রয়েছে।
শুক্রবার অ্যাক্সিওস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো বিশ্বাস করেন যে এই সপ্তাহান্তেই নতুন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে পারে। তিনি আরও দাবি করেছেন, ইরান গোপনে ‘ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য ক্ষমা চেয়েছে’। তবে এই বার্তাটি কীভাবে পৌঁছানো হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
এই কূটনৈতিক তোড়জোড় এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। এতে ৮ এপ্রিল থেকে যে যুদ্ধবিরতি চলছিল, তা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ট্রাম্প ও তার মিত্ররা বারবার ইরানের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে, আবার একইসঙ্গে বলছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি খুব কাছেই।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি জানান, একটি চুক্তির আশায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ধাপের আক্রমণ স্থগিত করেছেন।
সূত্র: আল জাজিরা


























