যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন তীব্র আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের আপস না করার অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। কঠিন অর্থনৈতিক সংকট ও কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যেও দেশটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সার্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক কাজের অগ্রগতি থামবে না।
এর মধ্যেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের এ পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বাহ্যিক কোনো কূটনৈতিক চাপ বা বাণিজ্যিক অবরোধের মুখে তারা এই কর্মসূচির মূল কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনবে না।
প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালে ইরানের তেল রপ্তানি পর্যবেক্ষণ শুরুর পর এই প্রথম কোনো এক মাসে দেশটির বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল ট্যাঙ্কারে তোলার তথ্য পাওয়া যায়নি। কেপলারের হিসাব বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকা ইরানের তেলের মজুতও দ্রুত কমেছে।
জুলাইয়ে যেখানে এই মজুতের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল ছিল, তা কমে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও সরকার নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয় বলেও তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রেজাই বলেন, জনগণের দুর্ভোগ সহ্য করার ক্ষেত্রে ইরান সরকারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলারও দেশটির বহু বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কেপলারের নীতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিবিষয়ক প্রধান মিশেল ব্রুহার্ড মনে করেন, ইরানের অনমনীয় অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এখনও অব্যাহত থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎপাদন যে হারে বাড়ানো হয়েছিল, তা এখন আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের বড় মজুত গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছে তেহরান।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কার এমটি অন পিসে হামলার ঘটনায় ১২ নাবিক আহত হয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্যাঙ্কারটিতে মোট ১৯ জন নাবিক ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৭ জন ভারতীয় এবং আহত ১২ জনের ১১ জনই ভারতের নাগরিক।
যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, একটি হুমকির বিষয়ে অবগত হওয়ার পর বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নেব্রাস্কার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি হুমকি সম্পর্কে জানতে পেরেছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোতে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সম্ভাবনা নিয়েও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, পশ্চিমাদের দাবি ইরান গোপনে অস্ত্র তৈরির দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যদিও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে দেশটির অর্থনীতিতে বর্তমানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর তদারকি আরও জোরদার করতে কঠোর ব্যবস্থার কথা ভাবছে। তবে যাবতীয় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে তেহরান তাদের নিজস্ব নীতিতেই অটল রয়েছে।
সোমবার আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসেছে, তখনই তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে সংলাপের পথ অনুসরণ করছে না।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে সংকট, সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
তেহরান আপাতত চাপের মুখেও তার অবস্থান পরিবর্তনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত না দেওয়ায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


























