| |
  • প্রচ্ছদ
  • Uncategorized
  • জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে বিপন্ন বাংলাদেশ
  • হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

    জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে বিপন্ন বাংলাদেশ

    Icon
    মোঃ শরীফুল ইসলাম
    প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ন

    বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের কৃষি খাতে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুগত ঝুঁকির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর আবাদি জমি এখন চরম সংকটে। একদিকে সমুদ্রের লোনা পানির আগ্রাসন, অন্যদিকে খরা, নদীভাঙন এবং অসময়ে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে দেশের চিরাচরিত কৃষি মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

    ​জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিজমির বর্তমান পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
    ​১. উপকূলীয় অঞ্চল: লবণাক্ততার গ্রাসে লাখ লাখ হেক্টর জমি
    ​সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী এবং কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ততা এখন প্রধান শত্রু। সমস্যা: ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সমুদ্রের লোনা পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি নদীর মাধ্যমে ভেতরের দিকে চলে আসছে।

    ​প্রভাব: জমিতে অতিরিক্ত লবণের কারণে আমন ও বোরো ধানের চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় বছরের পর বছর কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কৃষিজমিকে চিংড়ির ঘেরে রূপান্তর করছেন।

    ​২. বরেন্দ্র ও উত্তর অঞ্চল: তীব্র খরা ও পানির সংকট
    ​দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং দিনাজপুর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টির মাধ্যমে। ​সমস্যা: বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাওয়া। একই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে

    ​প্রভাব: সেচের পানির তীব্র সংকটে বোরো ও আমন চাষ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক উর্বর জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

    ​৩. হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল: আগাম বন্যা ও ফসলের অকাল মৃত্যু
    ​সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলের কৃষকরা প্রতিবছর প্রকৃতির চরম খামখেয়ালিপনার শিকার হচ্ছেন। সমস্যা: মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি ঢলের কারণে চৈত্র-বৈশাখ মাসেই (এপ্রিল-মে) আকস্মিক ও আগাম বন্যা (Flash Flood) দেখা দিচ্ছে।

    ​হাওরের একমাত্র ফসল ‘বোরো ধান’ পাকার আগেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল এক রাতের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।

    ​৪. নদী অববাহিকা ও চরাঞ্চল: ভাঙন ও বালুকাময় মরুভূমি
    ​পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও তিস্তা নদীর অববাহিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীভাঙন এবং চরের জমি মরুভূমিকরণ ত্বরান্বিত হচ্ছে।

    হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া এবং অসময়ে ভারী বৃষ্টির কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং তীব্র ভাঙন দেখা দিচ্ছে। ভাঙনের পর জেগে ওঠা নতুন চরে পলিমাটির চেয়ে বালুর পরিমাণ বেশি থাকছে।

    প্রতিবছর হাজার হাজার একর উর্বর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর বালুকাময় চরে ফসল ফলানো অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি ​কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ুর এই চরম ভাবাপন্ন আচরণের কারণে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

    আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ছে। এটি এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকিতে পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে।

    ​বিশেষজ্ঞদের অভিমতে “জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা সামলাতে হলে আমাদের দ্রুত লবণাক্ততা-সহনশীল, খরা-সহনশীল এবং বন্যা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সাথে আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।”

    আরও পড়ুন