উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, কক্সবাজার পৌর এলাকা ও পেকুয়ায় পৃথক স্থানে পাহাড়ধসে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা। এরমধ্যে পাঁচজনই শিশু রয়েছেন। রোববার (৫ জুলাই) দিবাগত রাতে প্রথম পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে উখিয়ার ১৫ নং জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে রাত দেড়টার দিকে।
পাহাড়ের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর মুহূর্তেই মাটিচাপা পড়ে পুরো পরিবার। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাসের লাশ উদ্ধার করেন।
আহত অবস্থায় পরিবারের আরও কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাত দুইটার দিকে কুতুপালংয়ের ৭ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নং ক্যাম্পে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন-উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) প্রাণ হারান।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা নিশ্চিত করেছেন, উখিয়ার তিনটি ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে মোট আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। তাদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই রাতে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নং ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে চাপা পড়ে আলী আকবর নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন একই পরিবারের আরও দুই সদস্য। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন।
এছাড়া পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসে মিনহাজ (৭) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সোমবার বিকেল প্রায় ৫টার দিকে উপজেলার টইটং ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের আলমের ঝিরি এলাকার খলিফা মুড়ায় এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত মিনহাজ স্থানীয় বাসিন্দা কলিম উল্লাহ ও রুবি আক্তারের ছেলে। স্থানীয় ইউপি সদস্য মঞ্জুর আলম জানান, কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের একটি অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। এ সময় মিনহাজ মাটিচাপা পড়ে গুরুতর আহত হয়। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হচ্ছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জনে।

সর্বশেষ এই মর্মান্তিক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে পাহাড়ধসে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১৩ জন, ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ২৭ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ৯ জন প্রাণ হারান। চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পেকুয়া ও কক্সবাজার শহরের পৃথক ঘটনায় প্রাণ গেছে আরও ১০ জনের।
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক যুগে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ প্রতি বর্ষায় একই ধরনের প্রাণহানি ঘটলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
সোমবার বিকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৭৭ মিলিমিটার। আরও দুই দিন ভারী বর্ষণ হতে পারে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেছেন, ভারী বর্ষণে আশ্রয়শিবিরের পাশাপাশি কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পাহাড়েও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলামের মতে, জেলার পাহাড়ধস পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি বিস্তার। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ কক্সবাজারের প্রায় ১৫ লাখ মানুষ সরাসরি ভূমিধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন।
তার দাবি, স্থানীয়দের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এর মধ্যে কক্সবাজার শহর ও শহরতলিতে প্রায় ৯ হাজার এবং জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় আরও ২১ হাজার পরিবার রয়েছে। অন্যদিকে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অন্তত ১১ হাজার ২৮১টি আশ্রয়স্থল ৩০ ডিগ্রির বেশি ঢালবিশিষ্ট পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এসব আশ্রয়ে প্রায় ৬৯ হাজার ৭৫০ জন রোহিঙ্গা প্রতিনিয়ত ভূমিধসের আশঙ্কা নিয়ে বসবাস করছেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় কক্সবাজারের জন্য আধুনিক ভূমিধস পূর্ব-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, স্যাটেলাইট চিত্র ও ভূপ্রকৃতিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকির সতর্কবার্তা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
গবেষণায় কক্সবাজার জেলায় ৯০০টি ভূমিধসপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও কক্সবাজার সদর উপজেলা। চকরিয়া ও মহেশখালীর কয়েকটি এলাকাও রয়েছে ঝুঁকির তালিকায়। এসব এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
এফএওর প্রতিনিধি রবার্ট ডি সিম্পসনের মতে, কক্সবাজারের পাহাড়ধস এখন আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি ক্রমেই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। অবৈধ পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে।
উখিয়া বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শাহিনুর ইসলাম শাহীন জানান, জেলায় প্রায় ৯ হাজার ৬৫৭ হেক্টর বনভূমি অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ১২ হাজার ৬০৫ একর বনভূমি ব্যক্তি পর্যায়ে দখল হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ বন বিভাগের প্রায় ১৫ হাজার একর বনভূমিজুড়ে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের দাবি, এবারও ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ার পর জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করছে। নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে মানুষকে সরিয়েও নিচ্ছে। তার ভাষ্য, কিন্তু বিকল্প আবাসনের অভাবে অনেক পরিবার কিছুদিন পর আবার পাহাড়ের পাদদেশেই ফিরে যায়। ফলে প্রতি বর্ষায় একই মানুষ বারবার একই ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেছেন, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ধাপে ধাপে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কাজ চলছে। পাশাপাশি দুর্যোগ প্রস্তুতি, স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও জায়গার সংকটের কারণে এসব উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপ্রতুল
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভা শেষে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। যারা পাহাড় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে।
























