| |
  • প্রচ্ছদ
  • বিশ্ব
  • কলকাতার রাস্তায় ক্যান্সার রোগী নিয়ে বাংলাদেশিরা
  • হোটেল সংকট

    কলকাতার রাস্তায় ক্যান্সার রোগী নিয়ে বাংলাদেশিরা

    Icon
    আন্তর্জাতিক ডেস্ক
    প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন

    একজনের সঙ্গে ক্যান্সার আক্রান্ত স্বজন, আরেকজনের পাশে লাগেজ। কারও গায়ে চাদর, কেউ আশ্রয় নিয়েছেন পলিথিনের নিচে। মাথার ওপর কখনো বৃষ্টি। কলকাতার ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালের সামনে এভাবেই রাত কাটছে বাংলাদেশিসহ পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের।

    হোটেল সংকটে অসুস্থ রোগী নিয়েই এখন তাদের ঠিকানা হাসপাতালের সামনের সড়ক। বর্ষাকাল হওয়ায় মশার উপদ্রবও কম নয়। ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুর আশঙ্কার মধ্যেই হাসপাতালের বাইরে রাত কাটাতে হচ্ছে অসুস্থ রোগী ও তাদের স্বজনদের। নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার।

    তার সঙ্গে গাড়ির হর্ন, রাস্তার কাজের ধুলো ও রাতের ব্যস্ত সড়কের শব্দ; সব মিলিয়ে হাসপাতালের সামনে দুর্বিষহ রাত্রিযাপন। এই মানুষগুলোর বড় একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছেন।

    তাদের অভিযোগ, শহরের কম খরচের হোটেলগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে বন্ধ। ফলে সামর্থ্যের মধ্যে থাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। কোথাও ঘর পাওয়া গেলেও ভাড়া চাওয়া হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার রুপি বা তারও বেশি। ফলে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাদের পরিবারের সামনে নতুন করে তৈরি হয়েছে আবাসন সংকট।

    বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঠাকুরপুকুর হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার ধারে সারি দিয়ে শুয়ে রয়েছেন বহু মানুষ। কারও মাথার পাশে লাগেজ, কারও সঙ্গে ওষুধপত্র, আবার কারও পাশে শুয়ে আছেন অসুস্থ রোগী। সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, ‘হোটেলে থাকতে দিচ্ছে না, রোগীকে নিয়ে কোথায় থাকব?’

    বাংলাদেশ থেকে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে আসা এক নারী নিজের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলেন, কখনও বৃষ্টি, কখনও মশা-মাছির উপদ্রব। আশপাশে কোনো শৌচাগার নেই। ক্যান্সারের যন্ত্রণার সঙ্গে এই দুর্ভোগও সহ্য করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

    আরেক বাংলাদেশি নারী আক্ষেপ করে বলেন, দুই দেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের আগে জানায়নি যে কলকাতায় কম খরচের বহু হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে। বহু টাকা খরচ করে চিকিৎসার জন্য ভারতে এসে এখন মাঝপথে ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। অথচ থাকার জায়গা না পেয়ে রাস্তায় রাত কাটাতে হচ্ছে।

    অপর এক বাংলাদেশি নারী বলেন, কয়েকদিন অন্য জায়গায় ছিলেন। এখন সস্তার হোটেল খুঁজে পাচ্ছেন না। হোটেলগুলোতে দেড় থেকে দুই হাজার রুপি চাওয়া হচ্ছে। সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় হাসপাতালের বাইরের রাস্তাতেই রাত কাটাতে হচ্ছে।

    তার আশঙ্কা, সঙ্গে টাকা, মোবাইল ফোন ও পাসপোর্ট রয়েছে, রাস্তায় ঘুমানোর সময় সেগুলো চুরি হয়ে গেলে কী হবে? দুই দেশের সরকারের কাছে দ্রুত সমস্যার সমাধানের আবেদন জানান তিনি। ওই নারী জানান, প্রায় আট বছর ধরে কলকাতায় চিকিৎসা করাচ্ছেন। এবার ফলোআপের জন্য এসেছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মুখে এই প্রথম পড়তে হয়েছে তাকে।

    অন্য এক বাংলাদেশি জানান, কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া হোটেলের তালিকা ধরে একাধিক জায়গায় ফোন করেছেন। কিন্তু অনেক হোটেল ফোন ধরছে না, আবার কোথাও ঘর নেই বলে জানানো হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে ফুটপাতেই রাত কাটাতে হচ্ছে।

    এই পরিস্থিতির খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ক্যান্সার হাসপাতালে প্রতিনিধি পাঠানো হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন ডেপুটি হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা।

    বৈঠক শেষে প্রতিনিধিরা বাইরে বেরিয়ে আসতেই প্রায় শতাধিক বাংলাদেশি তাদের ঘিরে ধরে নিজেদের সমস্যার কথা জানান। তাদের মূল অভিযোগ, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে থাকার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

    এরপর তাদের হাতে একটি হোটেলের তালিকা তুলে দেওয়া হয়। বলা হয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তালিকাটি দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে যোগাযোগ করলে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। তবে রাস্তায় থাকা বাংলাদেশিদের অভিযোগ, তালিকায় থাকা একাধিক নম্বরে ফোন করেও তারা ঘর পাননি। কোথাও ফোন ধরা হয়নি, আবার কোথাও জানানো হয়েছে, সব ঘর বুক হয়ে গেছে।

    এই হোটেল সংকটের সূত্রপাত গত ১৮ আগস্ট কলকাতার নিউমার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর। ওই ঘটনায় সাত বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়।

    ঘটনার পরই শহরের হোটেল ও আবাসনগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়। কলকাতা পুরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরের হোটেল, গেস্টহাউস ও লজ মিলিয়ে ৭০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই নির্ধারিত নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছিল না।

    এরপর সংশ্লিষ্ট হোটেল ও আবাসন খালি করে দিতে বলা হয় এবং নতুন করে অতিথি রাখার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পেছনে নিরাপত্তার কারণ থাকলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের যেসব প্রান্তিক মানুষ কম খরচের হোটেল বা লজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন।

    একদিকে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগের চিকিৎসার চাপ, অন্যদিকে থাকার জায়গা না পাওয়ার দুশ্চিন্তা। তার সঙ্গে বৃষ্টি, মশা, ধুলো, নিরাপত্তাহীনতা ও শৌচাগারের অভাব; সব মিলিয়ে হাসপাতালের বাইরে রাত কাটানো মানুষগুলোর দুর্ভোগ চরমে।

    নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ জরুরি। তবে সেই পদক্ষেপের বোঝা যদি অসুস্থ ও প্রান্তিক মানুষের কাঁধেই এসে পড়ে, তাহলে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে কে, হাসপাতালের বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো দুই বাংলার এই মানুষগুলোর চোখে এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

    আরও পড়ুন