| |
  • প্রচ্ছদ
  • বিশ্ব
  • কলকাতার হোটেলপাড়ায় বাংলাদেশিদের আতঙ্ক
  • কলকাতার হোটেলপাড়ায় বাংলাদেশিদের আতঙ্ক

    Icon
    আন্তর্জাতিক ডেস্ক
    প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৭ অপরাহ্ন

    কলকাতার নিউমার্কেটসংলগ্ন মীর্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে মঙ্গলবার গভীর রাতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশের সাত পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। ঘটনার পর নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, মীর্জা গালিব স্ট্রিট ও ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বৈধতা।

    স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রশাসনের নজরদারি ও অনুমোদন ব্যবস্থায় ঘাটতি না থাকলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে। নিউমার্কেটের আশপাশের এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি পর্যটকদের ‘প্রিয় হোটেলপাড়া’ হিসেবে চেনা হয়।

    বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ এই এলাকায় অবস্থান করেন। রফি আহমেদ কিদোয়াই স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, কলিন লেন, মীর্জা গালিব স্ট্রিট এবং এস এন ব্যানার্জি রোডজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশিদের পছন্দের অসংখ্য হোটেল ও গেস্টহাউস।

    কম খরচে থাকার সুযোগ, নিউমার্কেটের কাছাকাছি অবস্থান, ফুটপাতের খাবারের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশ-কলকাতা রুটের দূরপাল্লার বাস কাউন্টার থাকায় চিকিৎসাপ্রার্থী পর্যটকদের কাছে এলাকাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর এসব সুবিধার কারণেই বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রধান গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই অঞ্চল।

    বাংলাদেশি পর্যটকদের এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে বহু ব্যবসায়ী এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে হোটেল ও গেস্টহাউস গড়ে তুলেছেন। হোটেলের তুলনায় গেস্টহাউস পরিচালনা সহজ হওয়ায় অনেক আবাসিক ভবনই ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক আবাসনে রূপান্তরিত হয়েছে। কোনো কোনো বাড়ির মালিক পুরো ভবন কিংবা একটি অংশ ভাড়া দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নিজ বাড়ি ভাড়া দিয়ে অন্যত্র কম ভাড়ার বাসায় গিয়ে বসবাস করছেন।

    স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক ভবনকে হোটেল বা গেস্টহাউসে রূপান্তরের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। তা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে পৌরসভার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ভবনে পার্টিশন দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। অনেক স্থানে ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়মও মানা হচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

    এতদিন এসব হোটেল ও গেস্টহাউসে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে খুব একটা ভাবেননি মালিকেরা। সরু অলিগলির মধ্যে গড়ে ওঠা এসব আবাসনে নির্বিঘ্নেই চলছিল ব্যবসা। তবে মঙ্গলবার রাতের অগ্নিকাণ্ড সেই বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে।

    দুর্ঘটনার পর বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলের সামনে নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বহু মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে শোক প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগ এলাকায় নজরদারি ও তদারকি বাড়িয়েছে।

    ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বৈধতা এবং সেখানে চলা কথিত অবৈধ কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগে পড়েছেন অনেক মালিক। বাংলাদেশি পর্যটক সোহেল বলেন, এই ঘটনার পর সত্যিই ভয় তৈরি হয়েছে। আগে কখনো বিষয়টি নিয়ে এভাবে ভাবতে হয়নি।

    তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে এসব হোটেলে থেকেছেন। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত অনেক হোটেল ও গেস্টহাউসেরই প্রয়োজনীয় অনুমতি নেই। তার ভাষায়, বিষয়টি ভাবাই কঠিন।

    সোহেল জানান, একটি পাঁচতলা ভবনের মধ্যেই বিভিন্ন নামে ১০টি পর্যন্ত হোটেল বা গেস্টহাউস পরিচালনার তথ্য তিনি শুনেছেন। প্রতিটি তলায় প্লাইউড বা বোর্ড দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নেই বৈধ লাইসেন্স। কোথাও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, আবার অনেক হোটেলে ফায়ার সার্ভিসের কোনো অডিটও হয়নি।

    আরেক বাংলাদেশি পর্যটক মো. উজ্জ্বল খান বলেন, অনেক হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এতটাই সরু যে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়া সম্ভব নয়। অনেক ভবনে ফায়ার এক্সিট বা বিকল্প নিরাপদ পথ নেই। কোথাও আবার লোহার সিঁড়ি ব্যবহার করে উপরের তলায় ওঠানামার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

    তার অভিযোগ, একটি বিদ্যুৎ-সংযোগ থেকেই অনেক জায়গায় এসি, টেলিভিশনসহ একাধিক বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এসব ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

    মীর্জা গালিব স্ট্রিটের ব্যবসায়ী সমর দাস বলেন, ‘কলকাতার হোটেলপাড়ার এই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের পর্যটকদের মনে ভীতি তৈরি করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, তারা কি এসব হোটেল ও গেস্টহাউস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন?’

    এদিকে ঘটনার পর আতঙ্কে অনেক বাংলাদেশি পর্যটক তড়িঘড়ি করে হোটেল ছেড়ে দেশে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশিদের ভরসার আবাসনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কলকাতার এই হোটেলপাড়া এখন নিরাপত্তা ও বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

    আরও পড়ুন