৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • মুক্তমত
  • একটি ইতিহাসের সমাপ্তি
  • একটি ইতিহাসের সমাপ্তি

    Icon
    মোঃ শরীফুল ইসলাম
    প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

    বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এক শক্ত প্রতীক, আপসহীন রাজনীতির দৃঢ় উচ্চারণ বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের ইতিহাসে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দল-মত নির্বিশেষে তিনি অর্জন করেছেন সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সময়ের কঠিনতম বাঁকে দাঁড়িয়েও আপস না করার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা তাকে পরিণত করেছে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধায়।

    রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু হয় এক সংকটময় সময়ে।
    ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সদ্যগঠিত বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন। রাজনীতিতে নতুন হলেও তার দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বগুণ দ্রুতই তাকে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিয়ে আসে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
    পরে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পান এবং একই বছরের মে মাসে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩, ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলেও তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পুনর্নির্বাচিত হন।

    দলের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাকে মুখোমুখি হতে হয় স্বৈরশাসনের কঠিন বাস্তবতার। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতৃত্বে পরিণত হন খালেদা জিয়া।

    কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় না গিয়ে তিনি রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ১৯৮৭ সাল থেকে ‘এরশাদ হটাও’ এক দফা দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়। দীর্ঘ সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
    ১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালে জোটগত নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন তিনি।

    প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের চেয়ারপারসনের দায়িত্বও তিনি দুইবার পালন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তার একটি বিরল রেকর্ড রয়েছে; পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই বিজয় অর্জন।

    রাজনৈতিক জীবনে তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে গ্রেপ্তার হন তিনি। সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর তিনি একে একে মামলাগুলোতে জামিন লাভ করেন। কারাবাসের সময় তাকে বিদেশে পাঠানোর চাপ থাকলেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।

    আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তার রাজনৈতিক জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। গত ১৫ বছরে তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়, মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টিতে। এসব মামলায় তিনি টানা সাত বছর কারাবন্দি জীবন কাটান। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যে বাড়িতে তিনি টানা ২৮ বছর বসবাস করেছিলেন। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার ওই বাসভবনটি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন।

    দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে নির্যাতন, কারাবাস ও চাপের মুখেও খালেদা জিয়া কখনো তার অবস্থান থেকে সরে যাননি। দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস না করার মানসিকতাই তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশ ছাড়তে চাপ দেওয়া হলেও তিনি দেশ ছাড়েননি। বাংলাদেশের প্রশ্নে খালেদা জিয়া কখনো আপস করেননি।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া হয়ে থাকবেন হার না মানা দৃঢ়তার প্রতীক, আপসহীন নেতৃত্বের এক অনন্য নাম হয়ে।

    লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক, এশিয়ান দর্পণ

    আরও পড়ুন