বিগত সরকারের সময়ে গৃহীত প্রকল্পের মেয়াদপূর্তি, গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া ও টাকার অবমূল্যায়নসহ বেশ কিছু কারণে বিদেশি ঋণ পরিশোধে সরকারকে প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ।
আগামী দুই অর্থবছরেও প্রাক্কলনের তুলনায় যথাক্রমে ৫৬ শতাংশ ও ৫১ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হবে সরকারকে। বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই চাপের কারণে চলতি অর্থবছরসহ পরবর্তী দুই অর্থবছরের ঋণ পরিশোধসূচিতে বড় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে সরকারকে।
এতে সরকারকে বাড়তি বেগ পেতে হচ্ছে বলেও জানা গেছে। আরও জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে সরকারকে ২৯০ কোটি ইউএস ডলার ব্যয় করতে হবে বলে প্রাক্কলন করেছিল অর্থমন্ত্রণালয়।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই অঙ্ক ধরে ধরা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাপ্ত এক হিসাবে দেখা গেছে, বিদেশি ঋণ পরিশোধে এই অর্থবছরই ব্যয় করতে হবে ৪৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রাক্কলনের তুলনায় পরিশোধের অঙ্ক ৬২ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে অর্থ বিভাগের করা প্রক্ষেপন অনুযায়ী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং তার পরের অর্থবছরের (২০২৭-২৮) জন্য এই ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
তবে এখন দেখা যাচ্ছে আগামী অর্থবছরের জন্য বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় বেড়ে হবে ৪৮৭ কোটি ডলার এবং তারপরের অর্থবছরে তা বেড়ে হবে ৫০৪ কোটি ডলার। প্রাক্কলনের তুলনায় পরিশোধের চাপ বাড়ছে যথাক্রমে ৫৬ শতাংশ ও ৫১ শতাংশ।
অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। অর্থ বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,‘বিভিন্ন সময়ে নেওয়া বিদেশি ঋণের মেয়াদপূর্তি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে আগামী বছরগুলোতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। এ ছাড়াও ইউএস ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়নের ফলে টাকার অঙ্কে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে অবনমন হয়েছে। বর্তমানে দেশে ডলারের বিনিময় মূল্য ১২২ টাকা ৮৪ পয়সা। অথচ এসব ঋণ নেওয়ার সময় ডলারের দর ছিল ৮৪ টাকা বা তারও কম। এ পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বর্তমান তারল্য সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য ঋণ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৩৫১ কোটি ইউএস ডলার। এই ঋণের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে মেগা প্রকল্পগুলোতে। অর্থ বিভাগের হিসাব মতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বা ২০২৫ সালের জুন শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত (অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি) ঋণ স্থিতি ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। সরকারের মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৫৬ শতাংশ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ এবং অবশিষ্ট ৪৪ শতাংশ বিদেশি ঋণ।
দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর প্রকল্প ঋণের আসল পরিশোধ ২০২৮ সালে শুরু হবে, যেখানে বার্ষিক পরিশোধ ৫০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। তবে এই ঋণের সুদ পরিশোধ গত একবছর ধরে চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।
ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি লাইন-৬) মোট ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার৭১১ কোটি টাকা। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই ঋণ পরিশোধ করা শুরু হবে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে চীন থেকে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার বেশি। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। জাইকা থেকে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা।
এ ছাড়াও বিদেশি ঋণ নিয়ে আরও বড় প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার ৬৯০ কোাট টাকা ব্যয়ে চীনের ঋণে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্প, ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, জাপানী ঋণে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প ও যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্প।

